ই-নিলামে শাহজালাল বিমানবন্দরের পণ্য খালাস কীভাবে হবে

শাহজালাল বিমানবন্দর ই-নিলাম নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি একটি বিশেষ বিধিমালা জারি করেছে, যার মাধ্যমে বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ও দীর্ঘদিন অখালাসকৃত আমদানি পণ্য দ্রুত অনলাইন নিলামের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হবে। ২০২৬ সালের ১০ জুন জারি হওয়া এই আদেশ বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে এবং এতে পুরনো নিলাম প্রক্রিয়াকে আগের চেয়ে সহজ, স্বচ্ছ ও দ্রুততর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইট ইউনিট ও এক্সপ্রেস সার্ভিস ইউনিটে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে বহু টন আমদানি পণ্য খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। এই লেখায় শাহজালাল বিমানবন্দর ই-নিলাম বিধিমালার পেছনের কারণ, এর মূল নিয়মাবলি তা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।

শাহজালাল বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ড ও পণ্য জমে থাকার প্রেক্ষাপট

২০২৫ সালের ১৮ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইট ইউনিট ও এক্সপ্রেস সার্ভিস ইউনিটে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এই দুর্ঘটনার পর আমদানি কার্গো কমপ্লেক্সে পণ্য সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত শেড না থাকায় বহু অখালাসকৃত পণ্য খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছিল। দীর্ঘদিন খোলা জায়গায় থাকার ফলে পণ্যের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছিল।

বৃষ্টি, রোদ ও ধুলাবালির মধ্যে দিনের পর দিন পণ্য পড়ে থাকায় অনেক চালানের ব্যবহারযোগ্যতাও কমে যাচ্ছিল। পাশাপাশি পণ্য আটকে থাকায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ অপচয়ের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল, কারণ আমদানিকৃত প্রতিটি চালানের সঙ্গে শুল্ক ও রাজস্বের সম্পর্ক জড়িত থাকে। কার্গো কমপ্লেক্সের সীমিত জায়গায় এত বিপুল পরিমাণ পণ্য জমে থাকায় নতুন আমদানি পণ্যের জন্য জায়গা সংকুলান করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। ঠিক এই প্রেক্ষাপট থেকেই শাহজালাল বিমানবন্দর ই-নিলাম বিধিমালার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।

রিমুভাল লিস্ট অনুযায়ী কত টন পণ্য আটকে আছে

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃক প্রস্তুত করা রিমুভাল লিস্ট অনুযায়ী অখালাসকৃত পণ্যের পরিমাণ প্রায় ৩৬ টন। এই পণ্যের মধ্যে কতটুকু নিলামে এবং কতটুকু ইনভেন্টরি প্রক্রিয়ায় আছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো।

  • ৮.৪ টন পণ্যের নিলাম কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
  • ২৭.৩ টন পণ্যের ইনভেন্টরি কার্যক্রম এখনও সম্পন্ন হয়নি।

এই ২৭.৩ টন পণ্যই মূলত শাহজালাল বিমানবন্দর ই-নিলাম বিধিমালার মূল লক্ষ্য, কারণ এই বিপুল পরিমাণ পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তি করতে না পারলে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়তেই থাকবে।

পুরনো নিলাম পদ্ধতি ও সিলড টেন্ডারের সীমাবদ্ধতা

প্রথাগত নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাধারণত দীর্ঘ সময় লাগে এবং প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক জটিল। এই সমস্যা সমাধানের জন্য ঢাকা কাস্টম হাউস বিশেষ সিলড টেন্ডার পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিল। এই পদ্ধতিতে এয়ার ফ্রেইট ইউনিট থেকে প্রায় ২৭৮.৮৪ কেজি এবং এক্সপ্রেস সার্ভিস ইউনিট থেকে প্রায় ২,০৩১.০৪ কেজি পণ্য নিলামের মাধ্যমে খালাস করা সম্ভব হয়েছিল।

তবে মোট আটকে থাকা পণ্যের তুলনায় এই পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য। ফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, অবশিষ্ট ২৭.৩ টন পণ্যের জন্য আরও কার্যকর ও দ্রুতগতির একটি নিলাম পদ্ধতি প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন থেকেই শাহজালাল বিমানবন্দর ই-নিলাম বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়।

শাহজালাল বিমানবন্দর ই-নিলাম বিধিমালা ২০২৬ আসলে কী

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কাস্টমস আইন, ১৯৬৯-এর ধারা ২৩৭ থেকে ২৬৬ পর্যন্ত প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই বিশেষ বিধিমালা তৈরি করেছে। বিধিমালাটির নাম দেওয়া হয়েছে বিশেষ নিলাম বিধিমালা, ২০২৬। এটি মূলত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ার ফ্রেইট ইউনিট ও এক্সপ্রেস সার্ভিস ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত ও অখালাসকৃত আমদানি পণ্যের নিলামের জন্য প্রযোজ্য।

ঢাকা কাস্টম হাউস থেকে জারি করা একটি নির্দিষ্ট রিমুভাল লিস্ট, যার তারিখ ১৯ মে ২০২৬, তার আওতাভুক্ত পণ্যগুলোই এই বিধিমালার অধীনে নিলামের জন্য বিবেচিত হবে। গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, অর্থাৎ ২১ জুন ২০২৬ থেকে এই বিধিমালা কার্যকর হয়েছে।

শাহজালাল বিমানবন্দরের ই-নিলাম প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করবে

আগের ম্যানুয়াল ও সময়সাপেক্ষ পদ্ধতির পরিবর্তে এখন সম্পূর্ণ অনলাইন ই-নিলাম মডিউলের মাধ্যমে নিলাম পরিচালনা করা হবে। সাধারণভাবে এই প্রক্রিয়ার ধাপগুলো নিম্নরূপ হবে।

  1. নিলামযোগ্য পণ্যের তালিকা ও বিস্তারিত তথ্য অনলাইনে প্রকাশ করা হবে।
  2. আগ্রহী দরদাতাদের নির্ধারিত পদ্ধতিতে নিবন্ধন ও জামানত জমা দিতে হবে।
  3. নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে অনলাইনে দরপত্র বা বিড জমা দিতে হবে।
  4. সর্বোচ্চ ও বৈধ দরদাতাকে বিজয়ী হিসেবে নির্বাচন করা হবে।
  5. বিজয়ী দরদাতাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করে পণ্য খালাস করতে হবে।

এই কাঠামোর ফলে শাহজালাল বিমানবন্দরের ই-নিলাম প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ ও সময়সাশ্রয়ী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জামানত, মূল্য পরিশোধ ও পণ্য খালাসের নিয়ম

ই-নিলামে অংশগ্রহণের জন্য দরদাতাদের নির্ধারিত পরিমাণ জামানত জমা দিতে হয়। নিলামে জয়ী হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি মূল্য পরিশোধ করতে হবে, অন্যথায় জমা দেওয়া জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার নিয়ম রাখা হয়েছে। সময়মতো মূল্য পরিশোধ করলেই কেবল পণ্য খালাসের অনুমতি পাওয়া যাবে। এই কঠোর শর্ত রাখার উদ্দেশ্য হলো প্রকৃত ও আগ্রহী ব্যবসায়ীরাই যেন নিলামে অংশ নেয় এবং পণ্য খালাসে অহেতুক দেরি না হয়।

শাহজালাল বিমানবন্দর ই-নিলাম বিধিমালার আইনি ভিত্তি

বাংলাদেশে কাস্টমস সংক্রান্ত যাবতীয় বিধি-বিধান নিয়ন্ত্রিত হয় কাস্টমস আইন, ১৯৬৯ এর মাধ্যমে। এই আইনের ধারা ২৩৭ থেকে ২৬৬ পর্যন্ত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নিলাম-সংক্রান্ত বিধিমালা তৈরির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে আমদানিকৃত পণ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খালাস না হলে প্রচলিত নিলাম প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।

কিন্তু শাহজালাল বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ডের মতো ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়, যার ফলে আলাদা ও বিশেষায়িত একটি বিধিমালা তৈরি করতে হয়েছে। এই বিধিমালা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট রিমুভাল লিস্টের আওতাভুক্ত পণ্যের জন্য প্রযোজ্য হওয়ায় এটিকে একটি সীমিত পরিসরের, লক্ষ্যভিত্তিক সমাধান বলা যায়। ভবিষ্যতে অনুরূপ কোনো দুর্ঘটনা বা জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে এই বিধিমালার কাঠামো অনুসরণ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি দৃষ্টান্তও তৈরি হলো।

শাহজালাল বিমানবন্দর ই-নিলাম বিধিমালার গুরুত্ব ও প্রভাব

এই বিধিমালা কার্যকর হওয়ার ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি হবে। প্রথমত, দীর্ঘদিন আটকে থাকা পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, কার্গো কমপ্লেক্সে জমে থাকা পণ্যের চাপ কমবে, যা সামগ্রিক আমদানি কার্যক্রমকে সচল রাখতে সহায়তা করবে। তৃতীয়ত, অনলাইন ব্যবস্থার কারণে নিলাম প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়মের সুযোগ কমবে।

চতুর্থত, দেশের যেকোনো স্থান থেকে দরদাতারা অংশগ্রহণ করতে পারবেন, ফলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং সরকার আরও যুক্তিসঙ্গত মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ডিজিটাল নিলাম পদ্ধতি ভবিষ্যতে অন্যান্য বন্দর ও কাস্টমস স্টেশনেও অনুসরণ করা হলে সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে। আমদানিকারক, ক্লিয়ারিং এজেন্ট এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের জন্যও এই পদ্ধতি সময় ও খরচ দুটোই বাঁচাবে, কারণ এখন থেকে ঘরে বসেই অনলাইনে নিলাম প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

শাহজালাল বিমানবন্দর ই-নিলাম বিধিমালা কখন কার্যকর হয়েছে?

এই বিধিমালা বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার দিন থেকেই, অর্থাৎ ২১ জুন ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।

ই-নিলামে অংশ নিতে কী করতে হবে?

আগ্রহী দরদাতাদের নির্ধারিত পদ্ধতিতে নিবন্ধন করে জামানত জমা দিতে হয় এবং অনলাইন ই-নিলাম মডিউলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দরপত্র জমা দিতে হয়।

উপসংহার

সবমিলিয়ে বলা যায়, শাহজালাল বিমানবন্দর ই-নিলাম বিধিমালা ২০২৬ একটি সময়োচিত ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে রাখার ঝুঁকি কমিয়ে আনতে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করতে এই বিধিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের জন্য এই অনলাইন নিলাম ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও সহজলভ্য একটি বিকল্প হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা যায়।

About The Author

Leave a Reply