বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবাসীদের জন্য একটি নতুন ব্যাংকিং সুবিধা চালু করেছে, যার নাম NRCTA অ্যাকাউন্ট বা Non-Resident Convertible Taka Account। এই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিরা বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে দেশে একটি টাকার হিসাব খুলতে পারবেন, যেখানে বাজারভিত্তিক সুদ পাওয়া যায় এবং পুরো জমা চাইলে বিদেশেও ফেরত নেওয়া যায়।
২৩ জুন ২০২৬ তারিখে জারি করা FEPD-1 সার্কুলার নং ১৪ এর মাধ্যমে এই নিয়ম কার্যকর হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশি বা NRB হিসেবে পরিচিত যারা বিদেশে বসবাস করেন, তাদের সুবিধার জন্যই এই হিসাব তৈরি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীরা দেশে রেমিট্যান্স পাঠালেও সেই টাকা টাকা-মুদ্রায় রেখে বাজারভিত্তিক মুনাফা পাওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য কোনো হিসাব ছিল না। এই ঘাটতি পূরণ করতেই বাংলাদেশ ব্যাংক প্রবাসীদের জন্য টাকা সঞ্চয় হিসাব চালুর এই উদ্যোগ নিয়েছে।
এই লেখায় জানতে পারবেন Non-Resident Convertible Taka Account কিভাবে খোলা যায়, কী কী সুবিধা পাওয়া যায়, কোন কোন উৎস থেকে টাকা জমা করা যায় এবং এই অ্যাকাউন্ট থেকে ঋণ নেওয়ার নিয়ম কী। সহজ ভাষায় পুরো সার্কুলারের প্রতিটি শর্ত এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যাতে কোনো প্রবাসী বা তার পরিবারের সদস্য বিষয়টি সহজে বুঝতে পারেন।
Non-Resident Convertible Taka Account কি
NRCTA অ্যাকাউন্ট বা Non-Resident Convertible Taka Account হলো একটি টাকা-নির্ভর ব্যাংক হিসাব, যা প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে বা OBU তে খুলতে পারেন। সঞ্চয়ী হিসাব, চলতি হিসাব বা ফিক্সড ডিপোজিট, এই তিন ধরনের কোনো একটি রূপে এই হিসাব খোলা যায়। বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো রেমিট্যান্স টাকায় রূপান্তর করেই এই হিসাব খোলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এমন রূপান্তরযোগ্য হিসাব চালু থাকলে প্রবাসী আয় দেশে আসার প্রবণতা বাড়ে। অফশোর ব্যাংকিং অ্যাক্ট ২০২৪ এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট ১৯৪৭ এর ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংক এই নিয়ম জারি করেছে।
সাধারণ একটি বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবের সাথে এই হিসাবের মূল পার্থক্য হলো মুদ্রার ধরন। বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে ডলার বা অন্য কোনো বিদেশি মুদ্রা জমা থাকে, কিন্তু এই হিসাবে টাকা জমা থাকে, যদিও সেই টাকা বিদেশি মুদ্রা থেকেই রূপান্তরিত। ফলে প্রবাসীরা চাইলে টাকার বাজারমূল্য থেকে মুনাফা নেওয়ার সুযোগ পান, আবার প্রয়োজনে আবার বিদেশি মুদ্রায় ফিরিয়েও নিতে পারেন।
প্রবাসী বাংলাদেশি টাকা অ্যাকাউন্ট কারা খুলতে পারবেন
শুধুমাত্র প্রবাসী বাংলাদেশিরা এই হিসাব খুলতে পারবেন। দেশের ভেতরে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি এই সুবিধা নিতে পারবেন না। যারা চাকরি, ব্যবসা বা পড়াশোনার জন্য বিদেশে আছেন, তারা সরাসরি এই অ্যাকাউন্টের জন্য আবেদন করতে পারবেন। ব্যাংকগুলো চাইলে অনলাইন ইন্টারেক্টিভ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা দিতে পারবে। তবে এমন সুবিধা চালুর আগে প্রতিটি ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকে তাদের পণ্যের বৈশিষ্ট্য, পরিচালনা পদ্ধতি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার বিস্তারিত জানাতে হবে।
এর ফলে ভবিষ্যতে প্রবাসীরা দেশে আসার অপেক্ষা না করে বিদেশ থেকেই মোবাইল অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলার আবেদন করতে পারবেন বলে আশা করা যায়। এতে সময় ও খরচ দুটোই কমবে। অনেক ব্যাংক এখনো এই প্রক্রিয়া চালু করেনি, তবে সার্কুলারে স্পষ্টভাবে এই দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে।
Non-Resident Convertible Taka অ্যাকাউন্টে কী কী টাকা জমা করা যাবে
এই হিসাবে বিভিন্ন উৎস থেকে টাকা জমা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই বৈচিত্র্যই হিসাবটিকে নমনীয় করে তুলেছে। নিচে গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলো তুলে ধরা হলো:
- বিদেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে পাঠানো রেমিট্যান্স
- অন্য একটি NRCTA অ্যাকাউন্ট থেকে স্থানান্তরিত টাকা
- জমা টাকার ওপর অর্জিত সুদ বা মুনাফা
- আগে এই হিসাব থেকে করা বিদেশি বিনিয়োগের ফেরত আসা টাকা
- নতুন শেয়ার আবেদনের ফেরত টাকা
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সাধারণ বা বিশেষ অনুমোদন থাকলে অন্য কোনো রিফান্ড বা পেমেন্টও এই হিসাবে জমা করা যায়।
Convertible Taka অ্যাকাউন্টের সুদ ও টাকা ফেরত নেওয়ার নিয়ম
এই অ্যাকাউন্টে রাখা টাকায় বাজারভিত্তিক সুদ বা মুনাফা পাওয়া যায়। জমা করা মূল টাকা এবং তার অর্জিত সুদ, দুটোই সম্পূর্ণভাবে বিদেশে ফেরত নেওয়া যায়। আবার চাইলে দেশের ভেতরেও এই টাকা খরচ বা স্থানান্তর করা সম্ভব। নিচে কয়েকটি ব্যবহারের উপায় দেওয়া হলো।
- সাধারণ স্থানীয় খরচের জন্য ব্যবহার করা যায়
- অন্য NRCTA বা NRTA অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা যায়
- বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে রূপান্তর করা যায়
- শেয়ার কেনা বা পোর্টফোলিও বিনিয়োগে ব্যবহার করা যায়
এই নমনীয়তার কারণে প্রবাসীরা সহজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, টাকা দেশে রাখবেন নাকি বিদেশে ফেরত নেবেন।
NRCTA অ্যাকাউন্ট থেকে ঋণ নেওয়ার নিয়ম কি
এই হিসাবের জমা টাকা থেকে দুই ধরনের ঋণ সুবিধা রাখা হয়েছে। একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য, আরেকটি প্রবাসী নিজে বা তার পরিবারের জন্য।
বিশেষ অর্থনৈতিক জোনের প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ
অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট এই হিসাবের টাকা দিয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক জোনের টাইপ এ শিল্প প্রতিষ্ঠানকে টাকায় ঋণ দিতে পারবে। এই ঋণ শুধু বেতন, মজুরি ও বিদ্যুৎ-পানির বিলের মতো নিয়মিত খরচের জন্যই নেওয়া যাবে। প্রতিষ্ঠানটিকে এই ঋণ শুধুমাত্র রপ্তানি থেকে পাওয়া আয় দিয়েই ফেরত দিতে হবে।
প্রবাসী নিজে বা পরিবারের জন্য ঋণ
প্রবাসীর জমা টাকা জামানত রেখে দেশের ভেতরের ব্যাংক তাকে বা তার মনোনীত কাউকে ঋণ দিতে পারবে। ঋণ ব্যক্তিগত কাজে বা ব্যবসায় ব্যবহার করা যাবে, তবে কৃষি, বাগান-চাষ বা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় এই ঋণ দেওয়া যাবে না। বেশি ঝুঁকি, দীর্ঘ সময় লাগা এবং অনিশ্চিত আয়ের কারণেই এই তিন খাতকে বাদ রাখা হয়েছে। ঋণের টাকায় দেশে অ-প্রত্যাবর্তনযোগ্য বিনিয়োগ করা যাবে অথবা নিজের বসবাসের জন্য একটি বাড়ি কেনা যাবে। প্রবাসী যেন কোনো বিদেশি মুদ্রার বিনিময়ে এই জামানত দিতে রাজি না হন, ব্যাংককে সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। ঋণ ফেরত দিতে হবে হিসাবের জমা টাকা থেকে অথবা নতুন রেমিট্যান্স থেকে।
এই ব্যবস্থায় ব্যাংকের সাধারণ ঋণ অনুমোদনের নিয়মকানুনও সমানভাবে প্রযোজ্য থাকবে। অর্থাৎ জামানত থাকলেও ব্যাংক ইচ্ছামতো ঋণ দিতে পারবে না, বরং প্রচলিত ঋণনীতি অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। NRCTA অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া এই ধরনের ঋণের হিসাব ব্যাংককে আলাদাভাবে রাখতে হবে, যাতে অন্য কোনো তহবিলের সাথে মিশে না যায়। এই ব্যবস্থাকে বলা হয় ঋণ ফান্ডের রিং-ফেন্সিং, যা স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা দুটোই নিশ্চিত করে।
Convertible Taka Account খুলতে ব্যাংকের যে নিয়ম মানতে হবে
অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটগুলোকে অ্যাকাউন্ট খোলা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রচলিত সব নিয়ম মানতে হবে। গ্রাহক পরিচিতি যাচাই বা KYC প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বা AML/CFT মানদণ্ডও মেনে চলতে হবে। করসংক্রান্ত নিয়মাবলী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়মিত রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক থাকবে। বিশেষজ্ঞদের মতে এই কড়াকড়ি নিয়মের কারণেই বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রবাসীদের আস্থা বাড়বে।
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, কোনো অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট অনলাইন প্ল্যাটফর্মে NRCTA অ্যাকাউন্ট খোলার সুবিধা চালু করতে চাইলে আগে থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনুমোদন নিতে হবে। এই অনুমোদনের সময় ব্যাংককে দেখাতে হবে তাদের সাইবার সুরক্ষা ব্যবস্থা কতটা মজবুত এবং গ্রাহকের তথ্য কতটা সুরক্ষিত থাকবে। এভাবে ধাপে ধাপে যাচাই করার পরই কোনো নতুন সেবা বাজারে আনার অনুমতি দেওয়া হবে।
NRCTA অ্যাকাউন্ট কবে থেকে কার্যকর হয়েছে
সার্কুলারটি জারির দিন থেকেই কার্যকর হয়েছে, অর্থাৎ ২৩ জুন ২০২৬ থেকে। এটি জারি হয়েছে অফশোর ব্যাংকিং অ্যাক্ট ২০২৪ এর ধারা ১১(৭) ও ২৫(২) এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট ১৯৪৭ এর ধারা ২০(৩) এর ক্ষমতাবলে। বাংলাদেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটকে এই নির্দেশনা মানতে হবে। সার্কুলারটিতে স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট-১ এর পরিচালক মো. হারুন-অর-রশিদ। সার্কুলারটি বিস্তারিত দেখতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
Convertible Taka অ্যাকাউন্ট কি সবাই খুলতে পারবে
না, শুধুমাত্র প্রবাসী বাংলাদেশিরাই এই হিসাব খুলতে পারবেন। দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী কেউ এই সুবিধা পাবেন না।
Convertible Taka অ্যাকাউন্টে কত সুদ পাওয়া যায়
এই হিসাবে কোনো নির্দিষ্ট সুদের হার বেঁধে দেওয়া হয়নি। সুদ বা মুনাফা সম্পূর্ণভাবে বাজারভিত্তিক, যা ব্যাংক থেকে ব্যাংকে আলাদা হতে পারে।
Convertible Taka অ্যাকাউন্টের টাকা কি বিদেশে ফেরত নেওয়া যায়
হ্যাঁ, জমা করা মূল টাকা এবং তার সুদ দুটোই সম্পূর্ণভাবে বিদেশে ফেরত নেওয়া যায়। একই সাথে দেশের ভেতরেও খরচ বা বিনিয়োগ করা যায়।
Convertible Taka অ্যাকাউন্টের টাকা জামানত রেখে কি ঋণ পাওয়া যায়
হ্যাঁ, প্রবাসীর জমা টাকা জামানত রেখে তিনি নিজে বা তার মনোনীত কেউ দেশের ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারেন। তবে কৃষি, বাগান-চাষ বা রিয়েল এস্টেট খাতে এই ঋণ ব্যবহার করা যাবে না।
Convertible Taka অ্যাকাউন্ট কোথায় খোলা যাবে
তফসিলি ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটে এই হিসাব খোলা যাবে। অনেক ব্যাংক ভবিষ্যতে অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও এই সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
উপসংহার
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই সার্কুলারের মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য NRCTA অ্যাকাউন্ট বা Non-Resident Convertible Taka Account খোলার পথ খুলে গেছে। এই হিসাবে বাজারভিত্তিক সুদ পাওয়া যায়, টাকা বিদেশে ফেরত নেওয়া যায়, আবার দরকার হলে দেশেও বিনিয়োগ বা ঋণের জন্য জামানত রাখা যায়। প্রবাসীরা যদি ঠিকমতো নিয়মগুলো বুঝে এই সুবিধা নেন, তাহলে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি তাদের নিজের আর্থিক পরিকল্পনাও সহজ হবে।
