আয়কর রেয়াত পাওয়ার সহজ উপায়

প্রতি বছর ট্যাক্স রিটার্নের সময় একটাই প্রশ্ন মাথায় আসে, “এবার কতটকা আয়কর দিতে হবে?” কিন্তু আরেকটি প্রশ্ন যেটা অনেকে জিজ্ঞেসই করেন না সেটা হলো, “এবার কতটাকা আয়কর রেয়াত নিতে পারবো?”

হ্যাঁ, বাংলাদেশের আয়কর আইনে আপনাকে বৈধভাবে কর কমানোর সুযোগ দেওয়া আছে। এই সুযোগের নাম হলো বিনিয়োগ রেয়াত বা Investment Tax Rebate। কিন্তু সমস্যা হলো, হিসাবটা একটু জটিল মনে হয়। ট্যাক্স স্ল্যাব, বিনিয়োগের সীমা, রেয়াতের হার এত কিছু মনে রাখা কঠিন।

সেই সমস্যার সমাধান হিসেবে এসেছে বিনিয়োগ রেয়াত ক্যালকুলেটর। এই লেখাতে জানবেন, আয়কর রেয়াত কীভাবে পাবেন, এই ক্যালকুলেটর কী, কেন ব্যবহার করবেন এবং কীভাবে ব্যবহার করতে হয়।

আয়কর রেয়াত কী এবং কেন দরকার?

আয়কর রেয়াত মানে হলো, আপনি সরকার-অনুমোদিত কিছু খাতে বিনিয়োগ করলে সরকার আপনার মোট করের একটা অংশ অব্যহতি দেয়। এটাকেই বলে বিনিয়োগ রেয়াত

Income Tax Act 2023-এর Section 78 অনুযায়ী, একজন করদাতা তার করযোগ্য আয়ের সর্বোচ্চ ৩% পর্যন্ত বা বিনিয়োগের উপর ১৫% হারে রেয়াত পান। মোট রেয়াতের সর্বোচ্চ সীমা ১০ লাখ টাকা।

ধরুন আপনার বার্ষিক করযোগ্য আয় ৮ লাখ টাকা এবং আপনি সঞ্চয়পত্র ও DPS মিলিয়ে ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তাহলে আপনার রেয়াত হবে ২,০০,০০০ × ১৫% = ৩০,০০০ টাকা। মানে ৩০ হাজার টাকা কম ট্যাক্স দিতে হবে।

এই সুযোগটা না নিলে সেই টাকা সরাসরি সরকারের কোষাগারে চলে যাবে।

আয়কর রেয়াত পাওয়ার সহজ উপায় কী?

রেয়াত পেতে হলে মূলত তিনটি কাজ করতে হয়।

প্রথমত, অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। তবে এই বিনিয়োগটি অবশ্যই অর্থবছরের ভিতরেই থাকতে হবে। যেমন- আপনি যদি অর্থবছর ২০২৫-২০২৬ অর্থ্যাৎ ১লা জুলাই ২০২৫ থেকে ৩০শে জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে বিনিয়োগ করেন। তাহলে করবর্ষ ২০২৬-২০২৭ এ উক্ত বিনিয়োগের উপর কর রেয়াত নিতে পারবেন। সঞ্চয়পত্র, DPS, জীবন বিমা, শেয়ারবাজার এগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি বা একাধিক খাতে বিনিয়োগ করলেই চলবে।

দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগের প্রমাণপত্র সংগ্রহ করতে হবে। সঞ্চয়পত্রের সার্টিফিকেট, DPS স্টেটমেন্ট, বিমার প্রিমিয়াম রসিদ এগুলো সংরক্ষণ করুন।

তৃতীয়ত, ট্যাক্স রিটার্নে সঠিকভাবে বিনিয়োগের তথ্য উল্লেখ করতে হবে এবং রেয়াত দাবি করতে হবে।

মূল সমস্যা হলো, কত বিনিয়োগ করলে কত রেয়াত পাবেন সেটা নিজে হিসাব করা অনেকের কাছে কঠিন। ঠিক এই কাজটাই করে দেয় আমাদের বিনিয়োগ রেয়াত ক্যালকুলেটর

বিনিয়োগ রেয়াত ক্যালকুলেটর কী?

বিনিয়োগ রেয়াত ক্যালকুলেটর হলো একটি অনলাইন টুল যেটা আপনার আয় ও বিনিয়োগের তথ্য নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে হিসাব করে জানিয়ে দেয় সর্বনিম্ন কত টাকা বিনিয়োগ করলে সর্বোচ্চ কত টাকা কর রেয়াত পাওয়া যায়।

সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, বাড়িওয়ালা সকলের জন্যই এই ক্যালকুলেটর প্রযোজ্য।

বিনিয়োগ রেয়াত ক্যালকুলেটর ব্যবহারের সুবিধা

১. সময় বাঁচে অনেক

হাতে কলমে আয়কর হিসাব করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগতে পারে। ক্যালকুলেটর দিয়ে সেই কাজ হয় মাত্র ২-৩ মিনিটে। ট্যাক্স অ্যাডভাইজারের কাছে যাওয়ার দরকার নেই, দীর্ঘ ফর্ম পড়ার ঝামেলা নেই।

২. ভুলের সম্ভাবনা শূন্য

নিজে হিসাব করলে স্ল্যাব রেট ভুল হতে পারে, রেয়াতের সীমা ভুল ধরা যেতে পারে। ক্যালকুলেটর সর্বশেষ আয়কর আইন অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে সঠিক হিসাব দেয়।

৩. করমুক্ত সীমা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত হয়

সাধারণ করদাতা, নারী করদাতা, প্রবীণ নাগরিক বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ক্যালকুলেটর আপনার ক্যাটাগরি বুঝে সঠিক করমুক্ত সীমা নির্ধারণ করে।

৪. একাধিক আয়ের উৎস হিসাব করা যায়

বেতন আয়, বাড়িভাড়া আয়, ব্যবসায়িক আয় সব একসাথে যোগ করা যায়। প্রতিটি উৎসের জন্য আলাদা আলাদা হিসাব নিজে করার ঝামেলা নেই।

৫. সর্বোচ্চ রেয়াত নিশ্চিত হয়

ক্যালকুলেটর দেখিয়ে দেয় আপনি এখন কত রেয়াত পাচ্ছেন এবং আরও কত বিনিয়োগ করলে রেয়াত সর্বোচ্চ হবে। ফলে বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা সহজ হয়।

৬. PDF রিপোর্ট ডাউনলোড করা যায়

হিসাব শেষে সম্পূর্ণ ট্যাক্স রিপোর্ট PDF আকারে ডাউনলোড করা যায়। এই রিপোর্ট ট্যাক্স রিটার্ন দাখিলের সময় সরাসরি কাজে লাগে।

৭. সম্পূর্ণ বিনামূল্যে

কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই, কোনো পেমেন্ট নেই। যেকোনো সময়, যেকোনো ডিভাইস থেকে ব্যবহার করুন।

কীভাবে বিনিয়োগ রেয়াত ক্যালকুলেটর ব্যবহার করবেন?

ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা একদম সহজ। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।

ধাপ ১: করদাতার তথ্য দিন

প্রথমে আপনার করদাতার ধরন বেছে নিন, সাধারণ পুরুষ, নারী, প্রবীণ নাগরিক (৬৫+) বা প্রতিবন্ধী। এরপর বর্তমান অর্থবছর নির্বাচন করুন।

এই তথ্যের ভিত্তিতে ক্যালকুলেটর আপনার করমুক্ত সীমা নির্ধারণ করবে।

ধাপ ২: বেতন আয়ের তথ্য দিন

আপনি সরকারি না বেসরকারি চাকরি করেন সেটা বেছে নিন। এরপর প্রাপ্য বেতনের পরিমাণ উল্লেখ করুন।

ক্যালকুলেটর নিজেই অনুমোদিত কাটতি বাদ দিয়ে করযোগ্য বেতন আয় বের করে দেবে।

ধাপ ৩: বাড়িভাড়া আয় যোগ করুন (যদি থাকে)

বাড়ি বা ফ্ল্যাট ভাড়া দিলে বার্ষিক ভাড়া হতে আয়ের তথ্য দিন। ক্যালকুলেটর মেরামত ব্যয় বাদ দিয়ে নিট বাড়িভাড়া আয় বের করবে।

ধাপ ৪: অন্যান্য আয় যোগ করুন

ব্যাংক সুদ, ব্যবসার আয়, ফ্রিল্যান্সিং আয় বা অন্য যেকোনো আয় থাকলে এখানে যোগ করুন।

ধাপ ৫: ফলাফল দেখুন

সব তথ্য দেওয়া হলে “ক্যালকুলেট করুন” বাটনে ক্লিক করুন। সাথে সাথে দেখতে পাবেন মোট করযোগ্য আয়, মোট করদায়, প্রাপ্য বিনিয়োগ রেয়াত এবং প্রকৃত প্রদেয় কর।

ধাপ ৭: PDF রিপোর্ট ডাউনলোড করুন

ফলাফল দেখার পর “PDF ডাউনলোড করুন” বাটনে ক্লিক করলে একটি সম্পূর্ণ ট্যাক্স রিপোর্ট ডাউনলোড হবে। এটি ট্যাক্স রিটার্ন ফর্ম পূরণে সরাসরি সাহায্য করবে।

কোন কোন বিনিয়োগ খাতে রেয়াত পাবেন?

রেয়াত পাওয়ার জন্য আপনাকে অবশ্যই সরকার-অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। Income Tax Act 2023-এর ৬ষ্ঠ তফসিলে উল্লেখিত প্রধান খাতগুলো হলো:

সঞ্চয়পত্র: জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের যেকোনো সঞ্চয়পত্র। প্রতি আয়বর্ষে নতুন কেনা লাগবে, পুরনো কিস্তি রেয়াতের জন্য গণ্য হয় না।

জীবন বিমা: নিজের, স্ত্রী বা নাবালক সন্তানের বিমার প্রিমিয়াম। শর্ত হলো প্রিমিয়াম বীমার মূলধনের ১০%-এর বেশি হওয়া যাবে না।

DPS: যেকোনো তফসিলভুক্ত ব্যাংকে DPS করলে বার্ষিক সর্বোচ্চ ১,২০,০০০ টাকা পর্যন্ত রেয়াতযোগ্য। নতুন Income Tax Act 2023-এ এই সীমা আগের ৬০,০০০ থেকে দ্বিগুণ করা হয়েছে।

শেয়ারবাজার: DSE বা CSE-তে তালিকাভুক্ত শেয়ার, মিউচুয়াল ফান্ড বা ডিবেঞ্চারে বিনিয়োগ। কোনো ঊর্ধ্বসীমা নেই এবং ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত মূলধনী মুনাফা সম্পূর্ণ করমুক্ত।

প্রভিডেন্ট ফান্ড: NBR-স্বীকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ডে কর্মী ও নিয়োগকর্তার উভয় অবদানই রেয়াতযোগ্য।

যাকাত ফান্ড: Zakat Fund Management Act 2023-এর অধীনে যাকাত ফান্ডে দেওয়া অর্থ রেয়াতযোগ্য।

কারা এই ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারবেন?

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, ব্যবসায়ী ও স্ব-কর্মী, বাড়িভাড়া থেকে আয় করা ব্যক্তি, ফ্রিল্যান্সার, প্রবীণ নাগরিক এবং প্রথমবার ট্যাক্স রিটার্ন দিচ্ছেন এমন নতুন করদাতা সকলেই এই ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারবেন।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাংলাদেশের যেকোনো ব্যক্তি করদাতা এই ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারবেন।

শেষ কথা: এখনই আপনার রেয়াত হিসাব করুন

আয়কর রেয়াত পাওয়া কোনো বিশেষজ্ঞের কাজ নয়, এটা আপনার অধিকার। সরকার এই সুযোগ দিয়েছে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে। আপনি শুধু সঠিক খাতে বিনিয়োগ করুন এবং রিটার্নে সঠিকভাবে দেখান।

আমাদের বিনামূল্যের বিনিয়োগ রেয়াত ক্যালকুলেটর সেই কাজটাকে সহজ করে দিয়েছে। ২-৩ মিনিট সময় দিন, সঠিক তথ্য দিন, আর দেখুন আপনি এবছর কত টাকা কর বাঁচাতে পারছেন।

👉 এখনই ক্যালকুলেটর ব্যবহার করুন এবং আপনার প্রাপ্য রেয়াতটুকু নিশ্চিত করুন!

About The Author

Leave a Reply