সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর ফেরত পাবেন যেভাবে

আপনি কি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছেন? তাহলে সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর ফেরত পেতে কী করতে হবে তা জেনে রাখুন। আয়কর আইন অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে উৎসে কর কর্তন করা হয়। আগে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কেটে রাখা কর ছিল চূড়ান্ত দায়। এখন আর তা নয়। বছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দিলে আপনি অতিরিক্ত কাটা টাকা ফেরত পেতে পারেন। অনেক করদাতা এখনো জানেন না, কীভাবে এই টাকা ফেরত নিতে হয়। কী কী কাগজপত্র লাগবে, কোথা থেকে সংগ্রহ করবেন, আর কত দিনের মধ্যে টাকা ফেরত পাবেন, এসব প্রশ্নের উত্তর অনেকের কাছেই স্পষ্ট নয়। এই আর্টিকেলে আমরা পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব। আপনি যদি সঞ্চয়পত্র বিনিয়োগকারী হন, তাহলে লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন।

সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর ফেরত পাওয়ার নতুন নিয়ম কী

চলতি অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন জমার সময় ১ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে। এই বছর থেকে এনবিআরের নতুন নিয়ম কার্যকর হয়েছে। এখন সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে কেটে রাখা উৎসে কর রিটার্ন জমার সময় সমন্বয় করা যাবে। আগে এই কর ছিল চূড়ান্ত। ফলে বেশি কাটা হলেও তা ফেরত নেওয়ার সুযোগ ছিল না। এখন করযোগ্য আয় না থাকলে করদাতা পুরো টাকাই ফেরত পাবেন। এই পরিবর্তন ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় স্বস্তির খবর। তবে ফেরত পেতে হলে নির্দিষ্ট দলিল থাকতে হবে। এই দলিল ছাড়া সমন্বয়ের আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না।

অন্যদিকে, যদি কোনো করদাতার মোট আয়, অর্থাৎ সঞ্চয়পত্রের মুনাফাসহ অন্যান্য সকল উৎসের আয় মিলিয়ে, প্রযোজ্য কর হারের স্ল্যাব ১০ শতাংশের সীমা অতিক্রম করে, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। এক্ষেত্রে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কর্তনকৃত ১০ শতাংশ উৎসে কর যথেষ্ট বিবেচিত হবে না। কারণ, সামগ্রিক আয়ের ভিত্তিতে হিসাব করলে করদাতার প্রকৃত কর দায় ইতিমধ্যে কাটা করের চেয়ে বেশি দাঁড়াবে। এমন পরিস্থিতিতে করদাতাকে বাড়তি এই কর অংশ নিজ দায়িত্বে পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ, সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর কেবল ন্যূনতম পরিশোধ হিসেবে গণ্য হবে, চূড়ান্ত দায় হিসেবে নয়। যাঁদের বার্ষিক আয় তুলনামূলক বেশি এবং একাধিক উৎস থেকে আসে, তাঁদের এই বিষয়টি বিশেষভাবে মাথায় রাখা প্রয়োজন। কারণ রিটার্ন জমার সময় শুধু ফেরত পাওয়ার হিসাব নয়, বরং অতিরিক্ত কর পরিশোধের সম্ভাবনাও যাচাই করে নিতে হবে।

সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর টাকা ফেরত পেতে কী কী শর্ত পূরণ করতে হবে

সঞ্চয়পত্রের কাটা উৎসে কর ফেরত পেতে হলে করদাতাকে নিচের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে।

  • নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে আয়কর রিটার্ন জমা দিতে হবে
  • রিটার্নে সঞ্চয়পত্র থেকে অর্জিত মুনাফা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে
  • মুনাফার বিপরীতে কর্তনকৃত করের সঠিক পরিমাণ রিটার্নে উল্লেখ করতে হবে
  • রিটার্ন জমার সময় নিজের ব্যাংক হিসাব নম্বর সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে

উপরের এই তথ্যগুলোর যেকোনোটিতে ঘাটতি থাকলে সমন্বয় বা রিফান্ডের আবেদন আটকে যেতে পারে। তাই রিটার্ন জমার আগে প্রতিটি তথ্য একবার যাচাই করে নেওয়া ভালো। যাচাই-বাছাই শেষে প্রাপ্য অর্থ উল্লিখিত ব্যাংক হিসাবেই সরাসরি স্থানান্তর করা হয়।

সঞ্চয়পত্রে উৎসে কর্তনকৃত অতিরিক্ত কর ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কর্তনকৃত অতিরিক্ত কর ফেরত পেতে হলে করদাতাকে নির্দিষ্ট কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি নিচে তুলে ধরা হলো।

প্রথম ধাপ: রিটার্নে সঠিক তথ্য উপস্থাপন
করদাতাকে আয়কর রিটার্নে সঞ্চয়পত্র থেকে অর্জিত মুনাফা এবং তার বিপরীতে কর্তনকৃত উৎসে করের পরিমাণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। সঙ্গে দিতে হবে ব্যাংক হিসাব নম্বরও, যাতে ফেরতের অর্থ সরাসরি সেই হিসাবে পাঠানো যায়।

দ্বিতীয় ধাপ: প্রকৃত করদায় নির্ণয়
রিটার্নে সব আয় একত্র করে করদাতার প্রকৃত কর দায় হিসাব করতে হবে। যদি দেখা যায় সঞ্চয়পত্রের ওপর কর্তনকৃত কর প্রকৃত দায়ের চেয়ে বেশি, তাহলেই কেবল অতিরিক্ত অংশ রিফান্ডযোগ্য হবে।

তৃতীয় ধাপ: রিটার্ন প্রক্রিয়াকরণ ও রিফান্ড নির্ধারণ
স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে (Self-assessment) দাখিল করা রিটার্ন ধারা ১৮১ অনুযায়ী প্রক্রিয়াকরণ সম্পন্ন হওয়ার পর উপকর কমিশনার রিফান্ডের পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। এক্ষেত্রে ধারা ২২৪ অনুযায়ী করদাতা এই অতিরিক্ত অর্থ ফেরত পাওয়ার আইনগত অধিকারী হবেন, যদি তিনি প্রমাণ করতে পারেন যে প্রকৃত দায়ের চেয়ে বেশি কর কর্তন করা হয়েছে।

চতুর্থ ধাপ: সরাসরি ব্যাংক ট্রান্সফার
রিটার্ন প্রক্রিয়াকরণ শেষে যদি রিফান্ড পাওনা নিশ্চিত হয়, তাহলে ধারা ২১৫ অনুযায়ী সেই অর্থ ৬০ দিনের মধ্যে ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে করদাতার ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করতে হবে। আপিল বা অন্য কোনো আইনি কার্যধারার ফলে রিফান্ড তৈরি হলে, ধারা ২২৯ অনুযায়ী একই সময়সীমা প্রযোজ্য হবে।

বিশেষভাবে খেয়াল রাখার বিষয়

  • ব্যাংক হিসাবের তথ্য সঠিক ও হালনাগাদ না থাকলে ফেরত প্রক্রিয়া বিলম্বিত হতে পারে
  • করদাতার পূর্ববর্তী কোনো বছরের কর বকেয়া থাকলে উপকর কমিশনার রিফান্ডের অর্থ সেই বকেয়ার সঙ্গে সমন্বয় (Set off) করতে পারেন
  • এই সমন্বয় করার আগে করদাতাকে অবশ্যই শুনানির সুযোগ দিতে হবে

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর ফেরত পেতে কী কী কাগজ লাগবে?

স্থানীয় সঞ্চয় অফিস থেকে সংগ্রহ করা উৎসে কর কাটার প্রত্যয়নপত্র এবং রিটার্নে উল্লেখ করা ব্যাংক হিসাব নম্বর লাগবে।

টাকা ফেরত পেতে কত দিন সময় লাগে?

কর কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই শেষে সাধারণত ১২০ দিনের মধ্যে ব্যাংক হিসাবে টাকা ফেরত দেন।

সঞ্চয়পত্রে বর্তমানে উৎসে কর কত শতাংশ কাটা হয়?

বর্তমান আয়কর আইন অনুযায়ী সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ অগ্রিম কর কাটা হয়।

রিটার্ন জমার সেরা সময় কোনটি?

জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে রিটার্ন জমা দিলে করছাড়ের বাড়তি সুবিধা পাওয়া যায়।

শেষকথা

সব মিলিয়ে বলা যায়, সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর ফেরত পাওয়ার এই নতুন নিয়ম ছোট ও মাঝারি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। আগে যেখানে কাটা কর ছিল চূড়ান্ত, এখন সেখানে ন্যায্য হিসাব করে টাকা ফেরত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শুধু প্রয়োজন সঠিক সময়ে প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করা এবং নিয়ম মেনে রিটার্ন জমা দেওয়া। আপনি যদি সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে থাকেন, তাহলে দেরি না করে আজই স্থানীয় সঞ্চয় অফিসে যোগাযোগ করুন এবং নিজের প্রাপ্য বুঝে নিন।

এই তথ্য যদি আপনার উপকারে আসে, তাহলে লেখাটি লাইক করুন, নিচে কমেন্টে নিজের অভিজ্ঞতা বা প্রশ্ন জানান, আর যাঁরা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছেন তাঁদের সঙ্গে শেয়ার করে দিন। আপনার একটি শেয়ার হয়তো অন্য কারো হাজার টাকা ফেরত পেতে সাহায্য করবে।

About The Author

Leave a Reply