বিল পরিশোধে সুদমুক্ত নতুন ঋণ সুবিধা চালু করলো বাংলাদেশ ব্যাংক

মাস শেষে হাতে টাকা কম থাকলেও বিদ্যুৎ বিল, মোবাইল রিচার্জ কিংবা সন্তানের স্কুলের ফি তো আর থেমে থাকে না। ঠিক এই ধরনের সাময়িক তারল্য সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ে এসেছে একটি নতুন ডিজিটাল ঋণ সুবিধা, নাম ই-পেমেন্ট ক্রেডিট

২০২৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জারি করা বিআরপিডি-১ সার্কুলার নং ১৭ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোকে এই সুবিধা চালুর নির্দেশনা দিয়েছে। প্রচলিত সুদভিত্তিক ঋণের বদলে এটি হবে সম্পূর্ণ ফি-ভিত্তিক, তাৎক্ষণিক এবং সম্পূর্ণ ডিজিটাল একটি ঋণ ব্যবস্থা। যারা মাঝেমধ্যে হাতে টাকার টানাটানিতে দৈনন্দিন বিল পরিশোধে দেরি করে ফেলেন, তাদের জন্য এই সুবিধা কীভাবে কাজ করবে, কী কী শর্ত মানতে হবে এবং ফি কত লাগবে, সবকিছু এই লেখায় সহজ ভাষায় জানানো হলো।

ই-পেমেন্ট ক্রেডিট আসলে কী?

সাম্প্রতিক সময়ে ইন্টারনেট, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ডিজিটাল ডিভাইসের ব্যবহার বাড়ার সাথে সাথে বাংলাদেশে প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং ও অনলাইন আর্থিক লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে অনেক সময় সাময়িক তারল্য সংকটের কারণে গ্রাহকরা তাদের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় খরচ যেমন ইউটিলিটি বিল, মোবাইল রিচার্জ, শিক্ষা ফি, স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, আমানতের কিস্তি, বীমা প্রিমিয়াম কিংবা টোল-টিকিট সংক্রান্ত খরচ সময়মতো পরিশোধ করতে পারেন না। এর ফলে তারা প্রয়োজনীয় সেবা পেতে দেরি এবং আর্থিক জরিমানার সম্মুখীন হন।

এই সমস্যা সমাধানেই বাংলাদেশ ব্যাংক প্রচলিত সুদের বদলে ফি-ভিত্তিক, তাৎক্ষণিক ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল একটি ঋণ সুবিধা চালু করেছে, যার নাম “ই-পেমেন্ট ক্রেডিট”। এই ঋণ সুবিধার মাধ্যমে অনুমোদিত ডিজিটাল পেমেন্টের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের সেবার দায় নিষ্পত্তি করা যাবে।

কোন কোন খাতে ডিজিটাল ঋণ ব্যবহার করা যাবে?

সার্কুলার অনুযায়ী ই-পেমেন্ট ক্রেডিট সুবিধার আওতায় নিম্নলিখিত নয়টি খাতে সরাসরি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের হিসাবে পরিশোধের জন্য ঋণ দেওয়া যাবে:

১. ইউটিলিটি বিল

২. মোবাইল রিচার্জ

৩. শিক্ষা সংক্রান্ত ফি

৪. স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত খরচ

৫. টোল/টিকেট সংক্রান্ত খরচ

৬. ট্যাক্সসহ বিবিধ সরকারি ফি

৭. আমানতের কিস্তি

৮. বীমা প্রিমিয়াম

৯. বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত অন্যান্য ব্যয় বা ফি

    একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, এই ঋণের টাকা কখনোই নগদে রূপান্তর করা যাবে না, গ্রাহকের ওয়ালেটে অ্যাড মানি করা যাবে না, কিংবা অন্য কোনো হিসাবে স্থানান্তরও করা যাবে না। শুধুমাত্র নির্ধারিত সেবা প্রদানকারীর অনুকূলে অনুমোদিত ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি পরিশোধের জন্যই এই ঋণ ব্যবহার করতে হবে।

    ডিজিটাল ঋণের সীমা, মেয়াদ ও ফি কত হবে?

    ই-পেমেন্ট ক্রেডিট সুবিধার ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ডিজিটাল ঋণের পরিমাণ ও মেয়াদের ভিত্তিতে। নিচের সারণীতে এই হিসাব স্পষ্টভাবে দেখানো হলো:

    ঋণের সীমা (টাকা)৭ দিনের ফি১৫ দিনের ফি৩০ দিনের ফি
    ৫০ – ২৫০
    ২৫১ – ৫০০১৫
    ৫০১ – ১০০০১২২০
    ১০০১ – ২০০০১০২০৩০
    ২০০১ – ৩০০০১৫৩০৫০
    ৩০০১ – ৫০০০২০৪০৭০
    ৫০০১ – ৭০০০২৫৫০৯০
    ৭০০১ – ১০০০০৩৫৭০১৩০

    অর্থাৎ, যত কম সময়ের জন্য ঋণ নেওয়া হবে, ফি তত কম লাগবে। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি ২,০০০ টাকা মাত্র ৭ দিনের জন্য নেন, তাহলে ফি লাগবে মাত্র ১০ টাকা, কিন্তু একই পরিমাণ ৩০ দিনের জন্য নিলে ফি হবে ৩০ টাকা।

    ঋণের মূল অর্থ ও প্রযোজ্য ফি বিতরণের তারিখ থেকে ৮ম, ১৬তম অথবা ৩১তম দিনে সম্পূর্ণরূপে আদায় করতে হবে।

    সময়মতো ডিজিটাল ঋণ পরিশোধ না করলে কী হবে?

    গ্রাহক নির্ধারিত তারিখের মধ্যে প্রযোজ্য সার্ভিস ফিসহ বকেয়া ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত মেয়াদের জন্য দৈনিক ভিত্তিতে জরিমানা বা ফি আদায় করা যাবে। তবে শর্ত থাকে যে, অতিরিক্ত দিনের উপর আরোপিত জরিমানা কখনোই ৩০ দিন মেয়াদী ওই ঋণসীমার জন্য প্রযোজ্য দৈনিক ফি এর বেশি হবে না।

    সুখবর হলো, গ্রাহক চাইলে নির্ধারিত তারিখের আগে যেকোনো সময় ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন এবং সেক্ষেত্রে সারণিতে উল্লিখিত ফি ছাড়া অতিরিক্ত কোনো ফি, সুদ, প্রি-পেমেন্ট চার্জ কিংবা আর্লি সেটেলমেন্ট ফি আরোপ করা যাবে না।

    ডিজিটাল ঋণ গ্রহণে গ্রাহকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও শর্তাবলী

    এই ডিজিটাল ঋণ সুবিধা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রাখা হয়েছে:

    • সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়া: এই ঋণ সংক্রান্ত সকল কার্যক্রম ব্যাংকের অনুমোদিত অ্যাপের মাধ্যমে end-to-end ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে।
    • ডিজিটাল সম্মতি: ঋণের আবেদনে সরাসরি স্বাক্ষরের বদলে ডিজিটাল ব্যবস্থায় গ্রাহকের সম্মতি নিতে হবে।
    • পরিচয় যাচাই: নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে ওটিপিসহ টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) বা মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (MFA) ব্যবহার করে গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে।
    • স্বচ্ছতা: সম্মতি নেওয়ার আগে ঋণের প্রকৃতি, পরিমাণ, ফি, মেয়াদ এবং পরিশোধ পদ্ধতিসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ শর্তাবলী গ্রাহককে যথাযথভাবে জানাতে হবে।
    • সিআইবি চার্জমুক্ত: এই ঋণের ক্ষেত্রে সিআইবি অনুসন্ধান বাবদ গ্রাহকের উপর কোনো চার্জ আরোপ করা যাবে না।
    • তথ্য সুরক্ষা: ক্লাউড কম্পিউটিং ও সাইবার সিকিউরিটি সংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে গ্রাহক ও ঋণ সংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যে অবস্থিত ডেটা ওয়্যারহাউজে সংরক্ষণ করতে হবে।

    ব্যাংকের জন্য বাধ্যবাধকতা

    শুধু গ্রাহক সুবিধা নয়, ব্যাংকগুলোর জন্যও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে:

    • ব্যাংককে পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত নীতিমালার আওতায় বিকল্প ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং মডেল ব্যবহার এবং ঝুঁকিভিত্তিক ক্রেডিট সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
    • মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার (পিএসপি), পেমেন্ট সিস্টেম অপারেটর (পিএসও) এর মতো তৃতীয় পক্ষের সেবা সরবরাহ চ্যানেল ব্যবহার করা যাবে।
    • মানিলন্ডারিং (AML) ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন প্রতিরোধ (CFT) সংক্রান্ত বিদ্যমান নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করতে হবে।
    • ঋণ সংক্রান্ত তথ্য মাসিক ভিত্তিতে RIT টেমপ্লেটে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগে এবং ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে সংযুক্ত ছক অনুযায়ী পাঠাতে হবে।
    • খেলাপি ঋণগ্রহীতা তথ্য গোপন করে ঋণ নিয়ে থাকলে সিআইবি অনুসন্ধানে বিরূপ প্রতিবেদন পাওয়া মাত্র দ্রুততম সময়ের মধ্যে তা সমন্বয় করতে হবে।

    ডিজিটাল ঋণ বাণিজ্যিকভাবে চালুর আগে বাধ্যতামূলক পাইলটিং

    উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ই-পেমেন্ট ক্রেডিট সুবিধা সরাসরি বাণিজ্যিকভাবে চালু করা যাবে না। এটি চালুর আগে ব্যাংকগুলোকে আবশ্যিকভাবে ন্যূনতম ৬ (ছয়) মাসের জন্য পাইলটিং ভিত্তিতে কার্যক্রম সম্পাদন করতে হবে। পাইলটিং বাস্তবায়নের ফলাফল মূল্যায়ন এবং ইতিবাচক রিপোর্ট প্রাপ্তি সাপেক্ষে মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও অংশীজনের পরামর্শের আলোকে চূড়ান্ত পিপিজি প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে বাণিজ্যিকভাবে এই ঋণ কার্যক্রম চালু করতে হবে।

    বাণিজ্যিকভাবে চালুর ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ কে পাইলটিংয়ের মূল্যায়ন ও অনুমোদিত পিপিজি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে।

    সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

    ই-পেমেন্ট ক্রেডিট সুবিধায় সর্বোচ্চ কত টাকা ঋণ পাওয়া যাবে?

    সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে, যা শুধু নির্ধারিত ডিজিটাল চ্যানেলের মাধ্যমে সেবা প্রদানকারীর অনুকূলে সরাসরি পরিশোধ করা যাবে।

    ডিজিটাল ঋণের টাকা কি নগদ তোলা যাবে?

    না, এই ডিজিটাল ঋণের টাকা কখনোই নগদে রূপান্তর করা যাবে না বা ওয়ালেটে অ্যাড মানি করা যাবে না। শুধু নির্ধারিত সেবার বিল পরিশোধে ব্যবহার করা যাবে।

    ডিজিটাল ঋণে কি সুদ দিতে হবে?

    না, এটি সুদের পরিবর্তে ফি-ভিত্তিক একটি ঋণ সুবিধা। ফি নির্ধারিত হবে ঋণের পরিমাণ ও মেয়াদ অনুযায়ী।

    ই-পেমেন্ট ক্রেডিটের সর্বোচ্চ মেয়াদ কত দিন?

    সর্বোচ্চ মেয়াদ ৩০ দিন। এছাড়া ৭ দিন ও ১৫ দিন মেয়াদেও এই ঋণ নেওয়া যাবে।

    উপসংহার

    বাংলাদেশ ব্যাংকের এই ই-পেমেন্ট ক্রেডিট সুবিধা মূলত ক্যাশলেস সমাজ বিনির্মাণ ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সাময়িক তারল্য সংকটে যারা প্রায়ই বিল পরিশোধে সমস্যায় পড়েন, তাদের জন্য এই সুদমুক্ত, ফি-ভিত্তিক ও সম্পূর্ণ ডিজিটাল ঋণ ব্যবস্থা একটি স্বস্তির সমাধান হতে পারে।

    তবে যেহেতু ব্যাংকগুলোকে প্রথমে ৬ মাসের পাইলটিং সম্পন্ন করতে হবে, তাই এই সুবিধা বাস্তবে কবে থেকে গ্রাহকরা ব্যবহার করতে পারবেন, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার উপর। আপনার ব্যাংক এই সুবিধা চালু করেছে কিনা, তা জানতে নিজ ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ রাখাই হবে সবচেয়ে ভালো উপায়।

    About The Author

    Leave a Reply