বিদেশ যাওয়ার জন্য বিমান টিকিট কাটতে গিয়ে অনেকেই কার্ড পেমেন্টের জটিলতায় পড়েন। এই সমস্যা কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নতুন নির্দেশনা জারি করেছে। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা এই সার্কুলারে আন্তর্জাতিক কার্ডে বিমান টিকিট কেনার সুযোগ আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
আগে শুধু বাংলাদেশে কার্যরত এয়ারলাইনসের টিকিট আন্তর্জাতিক কার্ডে কেনা যেত, যদি সেই টিকিটের টাকা দেশের ভেতরেই নিষ্পত্তি হতো। নতুন নিয়মে বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিটের টাকা দেশের বাইরে নিষ্পত্তি হলেও এখন কার্ডে কেনা যাবে। এই লেখায় সার্কুলারের মূল বিষয়, কোন এয়ারলাইনসের টিকিট এই সুযোগে পড়ে এবং গ্রাহক হিসেবে কী জানা জরুরি, সবকিছু সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বিদেশি এয়ারলাইনস টিকিট কেনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা
বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-১ (FEPD-1) থেকে জারি করা এই সার্কুলারের নম্বর FEPD-1 Circular No. 39, তারিখ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬। এটি জারি হয়েছে ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের FE Circular No. 47-এর সম্প্রসারণ হিসেবে।
পুরোনো নিয়মে বলা হয়েছিল, বৈধ ভিসাধারী বাংলাদেশি নাগরিকরা দেশে কার্যরত এয়ারলাইনসের টিকিট আন্তর্জাতিক কার্ড দিয়ে কিনতে পারবেন, যদি সেই টিকিট বিক্রির টাকা বাংলাদেশে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকের মাধ্যমে পেমেন্ট সার্ভিস ব্যবস্থায় নিষ্পত্তি হয়। নতুন সার্কুলারে এই সুযোগ আরও বাড়ানো হয়েছে।
আন্তর্জাতিক কার্ডে বিমান টিকিট কেনার নিয়ম
এখন থেকে বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিটের টাকা যদি তাদের নিজস্ব আন্তর্জাতিক অ্যাকোয়ারিং ও পেমেন্ট সেটেলমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের বাইরে নিষ্পত্তি হয়, তাহলেও সেই টিকিট আন্তর্জাতিক কার্ডে কেনা যাবে। আগে এই ধরনের টিকিট কার্ডে কেনার সুযোগ ছিল না, কারণ টাকা দেশের ভেতরে নিষ্পত্তি হওয়ার শর্ত ছিল।
এর ফলে বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো স্থানীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমেই টিকিট বিক্রির টাকা নিষ্পত্তি করতে পারবে। গ্রাহকের জন্য এর সুবিধা হলো, অনলাইনে বিদেশি এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি কার্ড দিয়ে টিকিট কাটার পথ আরও সহজ হবে।
কোন এয়ারলাইনসের টিকিট আন্তর্জাতিক কার্ডে কেনা যাবে
FEPD-1 Circular No. 39 সার্কুলারের Annexure-A তে ১৭টি বিদেশি এয়ারলাইনসের নাম ও তাদের মার্চেন্ট ক্যাটাগরি কোড (MCC) উল্লেখ করা হয়েছে। অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো এই কোড দেখেই লেনদেন যোগ্য কি না যাচাই করবে।
| এয়ারলাইনস | আইএটিএ কোড |
|---|---|
| Air India | AI |
| Cathay Pacific Airways | CX |
| China Eastern Airlines | MU |
| China Southern Airlines | CZ |
| Emirates | EK |
| Flydubai | FZ |
| Gulf Air | GF |
| Kuwait Airways | KU |
| Malaysia Airlines | MH |
| Oman Air | WY |
| Qatar Airways | QR |
| Saudi Arabian Airlines (Saudia) | SV |
| Singapore Airlines | SQ |
| SriLankan Airlines | UL |
| Thai Airways International | TG |
| Turkish Airlines | TK |
| Air Arabia | G9 |
ট্রাভেল কোটার বাইরে টিকিট কেনা
এই সুবিধার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর আওতায় টিকিট কেনার খরচ বাংলাদেশি যাত্রীর বার্ষিক ভ্রমণ কোটার বাইরে থাকবে। অর্থাৎ টিকিট কেনায় ব্যয় হওয়া অর্থ নিয়মিত ট্রাভেল এনটাইটেলমেন্টের সাথে কাটা হবে না।
লেনদেন যাচাইয়ের পর অনুমোদিত ডিলার ব্যাংক গ্রাহকের আন্তর্জাতিক কার্ডে টিকিট কেনায় ব্যয় হওয়া অর্থ পুনরায় রিফিল বা রিপ্লেনিশ করতে পারবে। এই রিফিলের পুরো প্রক্রিয়া ব্যাংক ও কার্ডধারীর মধ্যে বিদ্যমান ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
দেশি এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রে কী পরিবর্তন হয়েছে
এই নতুন সুবিধা বাংলাদেশি এয়ারলাইনসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে যাওয়ার জন্য দেশি এয়ারলাইনসের টিকিট বিক্রির টাকা এখনো স্থানীয়ভাবে অর্জন ও নিষ্পত্তির বিদ্যমান নিয়ম মেনেই চলবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র বিদেশি এয়ারলাইনসের জন্যই এই বিদেশে-নিষ্পত্তির সুবিধা প্রযোজ্য।
বিদেশি এয়ারলাইনসের আয়ের টাকা কীভাবে হিসাব হবে
সার্কুলারে বলা হয়েছে, বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট বিক্রির টাকা যদি বিদেশে নিষ্পত্তি হয়, তাহলে সেই টাকা সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনসের প্রত্যাগমনযোগ্য উদ্বৃত্ত আয়ের (remittable surplus earnings) বিপরীতে সমন্বয় করা হবে। এই সমন্বয় হবে FEPD-1 Circular No. 08 (তারিখ ৭ মে ২০২৬) এর Part-B অনুযায়ী।
এর মানে হলো, বিদেশি এয়ারলাইনস যে পরিমাণ টাকা দেশের বাইরে আগেই নিষ্পত্তি করে নিয়েছে, তা বাংলাদেশ থেকে বৈধভাবে প্রত্যাগমনযোগ্য আয়ের হিসাব থেকে বাদ দেওয়া হবে। এতে একই টাকা দুইবার হিসাবে আসার সুযোগ থাকছে না।
অথোরাইজড ডিলার ব্যাংক টিকিট রিপোর্টিং
অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলোকে এই সুবিধার আওতায় হওয়া সব টিকিট কেনাকাটা বাংলাদেশ ব্যাংকে নিয়মিত রিপোর্টিং রুটিন অনুযায়ী জানাতে হবে। এর মধ্যে TM মডিউলের মাধ্যমেও রিপোর্ট করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে।
এছাড়া FE Circular No. 47/2025-এর বিদ্যমান শর্তগুলো অপরিবর্তিত থাকবে। নতুন সার্কুলার শুধু বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিটের ক্ষেত্রে সেটেলমেন্ট পদ্ধতির পরিধি বাড়িয়েছে, আগের মূল নিয়মকাঠামো বাতিল করেনি।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক কার্ডে কোন এয়ারলাইনসের টিকিট কেনা যাবে?
উত্তর: সার্কুলারের Annexure-A অনুযায়ী ১৭টি বিদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট কেনা যাবে, যেমন Emirates, Qatar Airways, Turkish Airlines, Singapore Airlines এবং আরও কয়েকটি।
প্রশ্ন: এই সুবিধা কি বাংলাদেশি এয়ারলাইনসের জন্যও প্রযোজ্য?
উত্তর: না। এই সুবিধা শুধু বিদেশি এয়ারলাইনসের জন্য প্রযোজ্য। বাংলাদেশি এয়ারলাইনসের টিকিট বিক্রি এখনো বিদ্যমান স্থানীয় নিষ্পত্তির নিয়ম মেনেই চলবে।
প্রশ্ন: টিকিট কেনার খরচ কি ট্রাভেল কোটা থেকে কাটা হবে?
উত্তর: না। এই সুবিধার আওতায় টিকিট কেনার খরচ বার্ষিক ভ্রমণ কোটার বাইরে থাকবে।
প্রশ্ন: ব্যাংক কি কার্ডের ব্যালেন্স আবার রিফিল করতে পারবে?
উত্তর: হ্যাঁ। লেনদেন যাচাইয়ের পর ব্যাংক টিকিট কেনায় ব্যয় হওয়া অর্থ পর্যন্ত কার্ড রিফিল করতে পারবে, ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের শর্ত অনুযায়ী।
শেষকথা
সহজভাবে বললে, বৈধ ভিসা থাকা একজন বাংলাদেশি যাত্রী এখন Emirates, Qatar Airways, Turkish Airlines বা Singapore Airlines-এর মতো এয়ারলাইনসের ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক কার্ড দিয়ে টিকিট কাটতে পারবেন, এয়ারলাইনসটি দেশের বাইরে টাকা নিষ্পত্তি করলেও। টিকিট কেনার খরচ ট্রাভেল কোটা থেকে কাটা যাবে না, এবং ব্যাংক প্রয়োজনে কার্ডের ব্যালেন্স পুনরায় রিফিল করতে পারবে।
তবে এই সুবিধা পেতে ভিসার প্রয়োজনীয়তা এবং এডি ব্যাংকের সঙ্গে কার্ডধারীর বিদ্যমান ব্যাংকিং সম্পর্কের শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। টিকিট কেনার আগে নিজের ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভালো।