সেবার উপর উৎসে কর কর্তনের হার নির্ভর করে সেবার প্রকৃতি ও প্রাপকের ধরনের উপর। আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ৯০ অনুযায়ী কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক অন্য কোনো নিবাসীকে সেবার জন্য অর্থ প্রদানের সময় নির্ধারিত হারে উৎসে কর কর্তন করতে হয়, যা সর্বনিম্ন ১% থেকে সর্বোচ্চ ২০% পর্যন্ত হতে পারে।
পরামর্শক ফি, পেশাদার সেবা ফি, কারিগরি সহায়তা ফি, পরিবহন সেবা, ইন্টারনেট সেবা সহ বিভিন্ন খাতে আলাদা আলাদা হার নির্ধারিত আছে। উৎসে কর বিধিমালা ২০২৬ অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অর্থ পরিশোধের সময়ই কর্তন করতে হবে। এই লেখায় সেবার সকল শ্রেণীর হার একটি সম্পূর্ণ টেবিলে দেওয়া হলো, সাথে ব্যতিক্রম ও তুলনামূলক হিসাবের নিয়মও আলোচনা করা হলো।
ধারা ৯০ অনুযায়ী সেবার উপর উৎসে কর কেন কর্তন করা হয়
ধারা ৯০ এর অধীন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কর্তৃক কোনো নিবাসীকে সেবার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সারণী মোতাবেক উৎসে কর কর্তন করতে হয়। এই নিয়মের উদ্দেশ্য হলো সেবাদাতার আয়কর দায় আগে থেকেই আংশিক আদায় করে রাখা। প্রতিটি সেবার ধরন অনুযায়ী আলাদা হার প্রযোজ্য হয়।
স্বাভাবিক ব্যক্তি এবং স্বাভাবিক ব্যক্তি ব্যতীত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সাধারণত ভিন্ন হার দেখা যায়। তাই সেবার উপর উৎসে কর কর্তনের হার প্রয়োগের আগে প্রাপকের ধরন যাচাই করা জরুরি।
সেবার উপর উৎসে কর কর্তনের সম্পূর্ণ হার তালিকা
নিচের টেবিলে ধারা ৯০ এর সারণী অনুযায়ী সকল শ্রেণীর সেবার উৎসে কর কর্তনের হার দেওয়া হলো।
| ক্রমিক নং | সেবার বিবরণ | হার |
|---|---|---|
| ১ | উপদেষ্টা বা পরামর্শক ফি | স্বাভাবিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ১৫%, অন্যান্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৭.৫% |
| ২ | পেশাদার সেবা (professional service) ফি | স্বাভাবিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ১৫%, অন্যান্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে ৭.৫% |
| ৩ | কারিগরি সেবা ফি বা কারিগরি সহায়তা ফি (technical know-how or assistance fee) | স্বাভাবিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ১৫%, অন্যান্য ব্যক্তির ক্ষেত্রে ১০% |
| ৪ | ক) ক্লিনিং খ) ব্যক্তিগত নিরাপত্তা গ) জনবল সরবরাহ ঘ) ফ্রেইট ফরওয়ার্ড মিডিয়া ঙ) প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এজেন্সি সেবা | কমিশনের উপর ১০%, মোট বিলের উপর ১% |
| ৫ | ক) ক্যাটারিং খ) জনসংযোগ গ) ইভেন্ট পরিচালনা ঘ) প্রশিক্ষণ বা কর্মশালা পরিচালনা ঙ) কুরিয়ার সার্ভিস চ) প্যাকিং ও শিফটিং ছ) সংগ্রহ ও পুনরুদ্ধার এজেন্সি জ) একই প্রকৃতির অন্যান্য সেবা | মোট বিলের উপর ২% |
| ৬ | ইনডেন্টিং কমিশনের উপর | ৭.৫% |
| ৭ | মিটিং ফি, ট্রেনিং ফি বা সম্মানী বিলের উপর | ২০% |
| ৮ | মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর কর্তৃক প্রদত্ত বিলের উপর | ১০% |
| ৯ | ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি বিলের উপর | ১০% |
| ১০ | মোটর গ্যারেজ বা ওয়ার্কশপ বিলের উপর | ৫% |
| ১১ | ব্যক্তিগত কন্টেইনার পোর্ট বা ডকইয়ার্ড বিলের উপর | ৫% |
| ১২ | শিপিং এজেন্সি সেবা | কমিশনের উপর ১০%, মোট বিলের উপর ১% |
| ১৩ | স্টিভেডরিং, বার্থ অপারেটর, টার্মিনাল অপারেটর বা শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর বিলের উপর | কমিশনের উপর ১০%, মোট বিলের উপর ৫% |
| ১৪ | ক) পরিবহন সেবা, গাড়ি ভাড়া, ক্যারিয়িং সেবা, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সেবা খ) রাইড শেয়ারিং সেবা, ওয়ার্কিং স্পেস সরবরাহ সেবা, আবাসন সরবরাহ সেবাসহ যেকোনো শেয়ারিং ইকোনমিক প্ল্যাটফর্ম সেবার মোট বিলের উপর | ২% |
| ১৫ | বিদ্যুৎ সঞ্চালনায় নিমিত্ত হুইলিং চার্জ বাবদ মোট বিলের উপর | ৩% |
| ১৬ | ইন্টারনেট সেবা বিলের উপর | ৫% |
| ১৭ | মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্সি বা চ্যানেল পার্টনারের কমিশনের উপর | ১০% |
| ১৮ | ফ্রেইট ফরওয়ার্ড বাবদ পরিশোধিত কমিশন (কমিশনসহ বা কমিশন ব্যতিরেকে গ্রস বিলের উপর) | কমিশনের উপর ১০%, মোট বিলের উপর ১% |
| ১৯ | উপরের ১ থেকে ১৮ নং ক্রমিকে বর্ণিত হয়নি এবং আইনের অন্য কোনো ধারার অধীন কর্তনযোগ্য নয় এমন যেকোনো সেবা | ১০% |
এই সারণী থেকে বোঝা যায়, মিটিং বা ট্রেনিং ফি এবং সম্মানী বিলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ২০% হারে সেবার উপর উৎসে কর কর্তন করতে হয়। অন্যদিকে পরিবহন সেবা ও শেয়ারিং ইকোনমি সেবার ক্ষেত্রে হার তুলনামূলক কম, মাত্র ২%।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম
বিধিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। সারণীর ১ থেকে ১৮ নং ক্রমিকে বর্ণিত ক্ষেত্র ব্যতীত অন্য কোনো সেবা যদি কোনো ব্যাংক, ইন্স্যুরেন্স, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রদত্ত হয়, তাহলে সেই সেবার উপর এই বিধির অধীন কর কর্তন প্রযোজ্য হবে না। এই ব্যতিক্রম শুধুমাত্র নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক সেবাদাতার জন্য প্রযোজ্য।
কমিশন ও মোট বিলের মধ্যে কোনটি বেশি সেই হিসাবের নিয়ম
সারণীর ৪, ১২, ১৩ ও ১৮ নং ক্রমিকে উভয় ক্ষেত্রেই কমিশন বা ফি এবং মোট বিল উল্লেখ থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দুটি হিসাবের মধ্যে যেটি বেশি সেটিই কর হিসেবে পরিশোধ করতে হয়। হিসাবের পদ্ধতি নিচে দেওয়া হলো।
১. প্রথমে কমিশন বা ফি এর উপর সারণীতে প্রদত্ত হার প্রয়োগ করে একটি অংক বের করতে হবে, একে “ক” ধরা হয়
২. এরপর মোট বিলের উপর সারণীতে প্রদত্ত হার প্রয়োগ করে আরেকটি অংক বের করতে হবে, একে “খ” ধরা হয়
৩. সবশেষে “ক” এবং “খ” এর মধ্যে যেটি বেশি সেটি প্রকৃত উৎসে করের পরিমাণ হিসেবে পরিশোধ করতে হবে
এই নিয়মের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি রোধ করা হয়। শিপিং এজেন্সি বা ফ্রেইট ফরওয়ার্ডের মতো সেবায় এই তুলনামূলক হিসাব বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
করমুক্ত বা হ্রাসকৃত হারে সেবার উপর উৎসে কর কর্তনের সনদ
কোনো আয়বর্ষে কোনো প্রাপকের আয় করমুক্ত বা হ্রাসকৃত হারে করারোপযোগ্য হলে, প্রাপক বোর্ডের কাছে আবেদন করতে পারেন। বোর্ড যাচাই সাপেক্ষে একটি সনদ প্রদান করবে। সেই সনদে উল্লেখ থাকবে যে প্রাপককে প্রদেয় অর্থ থেকে কোনো কর কর্তন ছাড়াই বা হ্রাসকৃত হারে কর্তন করা যাবে। এই সনদ ছাড়া পরিশোধকারীকে স্বাভাবিক হার অনুসরণ করতে হবে।
সেবার উপর উৎসে কর কর্তনের সময় খেয়াল রাখার বিষয়
দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অর্থ পরিশোধের সময়ই কর্তন করতে হয়, পরে করলে চলবে না। প্রাপক স্বাভাবিক ব্যক্তি নাকি প্রাতিষ্ঠানিক প্রাপক তা প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে। সেবার প্রকৃতি সারণীর কোন ক্রমিকের সাথে মিলে যায় তা যাচাই করতে হবে।
- প্রাপকের প্রকার অনুযায়ী হার ভিন্ন হতে পারে কিনা তা যাচাই করতে হবে
- কমিশন ও মোট বিল উভয়ই থাকলে তুলনামূলক হিসাব করতে হবে
- প্রাপকের কোনো ছাড়ের সনদ আছে কিনা তা যাচাই করতে হবে
এই বিষয়গুলো মাথায় রাখলে সেবার উপর উৎসে কর কর্তনে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
সেবার উপর উৎসে কর কর্তনের সর্বোচ্চ হার কত?
সারণী অনুযায়ী সর্বোচ্চ হার হলো ২০%, যা মিটিং ফি, ট্রেনিং ফি বা সম্মানী বিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
পরামর্শক ফির উপর কত হারে উৎসে কর কাটতে হয়?
স্বাভাবিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে ১৫% এবং স্বাভাবিক ব্যক্তি ব্যতীত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৭.৫% হারে উৎসে কর কর্তন করতে হয়।
ইন্টারনেট সেবা বিলের উপর কত হারে কর কাটা হয়?
ইন্টারনেট সেবা বিলের উপর ৫% হারে উৎসে কর কর্তন করতে হয়।
উপসংহার
সেবাদাতা ও সেবাগ্রহীতা উভয়ের জন্য সেবার উপর উৎসে কর কর্তনের হার সঠিকভাবে জানা প্রয়োজন। প্রতিটি সেবার শ্রেণী অনুযায়ী আলাদা হার থাকায় সঠিক ক্রমিক চিহ্নিত করে কর কর্তন করতে হবে। কমিশন ও মোট বিল উভয়ই প্রযোজ্য হলে তুলনামূলক হিসাব করে বেশি অংকটি পরিশোধ করতে হবে। সঠিক নিয়ম মেনে চললে ব্যবসায়িক লেনদেনে আইনি জটিলতা এড়ানো সহজ হয়।
