পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন বা গ্রাহক সম্মতিপত্র হলো বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে চেক জালিয়াতি রোধের একটি কার্যকর পদ্ধতি। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সার্কুলার জারি করেছে, যা সকল তফসিলী ব্যাংকের জন্য বাধ্যতামূলক।
আজকাল জাল চেক তৈরি, স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং চেকের তথ্য পরিবর্তন করে প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। এই ধরনের ঘটনা থেকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি গ্রাহক উভয়কেই রক্ষা করতেই মূলত পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন চালু করা হয়েছে।
আপনি জানতে পারবেন পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন ঠিক কী, কোন ধরনের চেকের জন্য এটি বাধ্যতামূলক, এটি না দিলে কী হয় এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে এই নিয়ম মেনে চলতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের PSD সার্কুলার নং-০৮/২০১৩-এর আলোকে প্রতিটি বিষয় সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন কী এবং এর উদ্দেশ্য কী
পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে চেক ইস্যুকারী গ্রাহক ব্যাংককে আগেভাগে জানিয়ে দেন যে তিনি কত টাকার, কোন তারিখের এবং কার নামে একটি চেক ইস্যু করেছেন। এই তথ্যটিই হলো গ্রাহকের সম্মতিপত্র বা Positive Pay Instruction।
Paying Bank পরে যখন সেই চেকটি পরিশোধ করতে যায়, তখন গ্রাহকের দেওয়া তথ্যের সাথে চেকের তথ্য মিলিয়ে দেখে। সবকিছু মিলে গেলে চেকটি পরিশোধ হয়। না মিললে সন্দেহজনক চেকটি আটকে দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে জাল বা পরিবর্তিত চেক দিয়ে কেউ টাকা তুলতে পারে না।
বাংলাদেশ ব্যাংক এই নির্দেশনা জারি করেছে মূলত BACH (Bangladesh Automated Clearing House) ব্যবস্থায় চেক নিষ্পত্তিকে আরও নিরাপদ করতে। BACH হলো দেশের ইলেকট্রনিক চেক ক্লিয়ারিং সিস্টেম, যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার চেক প্রসেস হয়।
কোন কোন চেকের জন্য গ্রাহক সম্মতিপত্র বাধ্যতামূলক
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, নিচের ক্ষেত্রে গ্রাহক সম্মতিপত্র বা পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন দেওয়া বাধ্যতামূলক:
কর্পোরেট ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের জন্য:
- এক লক্ষ টাকা ও তার বেশি মূল্যমানের সকল চেকের জন্য সম্মতিপত্র দিতে হবে
ব্যক্তি হিসাবধারীদের জন্য:
- পাঁচ লক্ষ টাকা ও তার বেশি মূল্যমানের চেকের জন্য সম্মতিপত্র বাধ্যতামূলক
অর্থাৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সীমা তুলনামূলক কম রাখা হয়েছে, কারণ প্রাতিষ্ঠানিক লেনদেনে জালিয়াতির ঝুঁকি বেশি থাকে। একইসাথে ব্যক্তিগত হিসাবের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের চেকের জন্যও এই নিয়ম প্রযোজ্য।
BACH সিস্টেমে কীভাবে পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন কাজ করে
BACH চেক নিষ্পত্তি ব্যবস্থায় পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশনের পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে বোঝা দরকার।
ধাপ ১: গ্রাহক চেক ইস্যু করার আগে বা সাথে সাথে ব্যাংককে চেকের তথ্য জানান। এই তথ্যে সাধারণত চেক নম্বর, তারিখ, পরিমাণ এবং প্রাপকের নাম থাকে।
ধাপ ২: ব্যাংক এই তথ্য তাদের সিস্টেমে রেকর্ড করে রাখে।
ধাপ ৩: চেকটি যখন BACH-এর মাধ্যমে Paying Bank-এ পরিশোধের জন্য আসে, তখন সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেকের তথ্যের সাথে গ্রাহকের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখে।
ধাপ ৪: তথ্য মিলে গেলে চেক পরিশোধ হয়। তথ্য না মিললে বা সম্মতিপত্র না থাকলে চেকটি “Advice not Received” কারণ দেখিয়ে ফেরত পাঠানো যায়।
এই পদ্ধতিতে MICR Line পরিবর্তন, টাকার অঙ্ক বাড়ানো বা প্রাপকের নাম পরিবর্তন করে কেউ সুবিধা নিতে পারে না।
কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন পাঠানোর নিয়ম
কর্পোরেট বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন পাঠানোর ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হবে।
প্রথমত, প্রতিষ্ঠানের যেকোনো অনুমোদিত চেক ইস্যু করার সাথে সাথে ব্যাংককে সংশ্লিষ্ট তথ্য জানাতে হবে। এই তথ্য ব্যাংকের নির্ধারিত ফর্মে, অনলাইন পোর্টালে বা ইমেইলে পাঠানো যেতে পারে। প্রতিটি ব্যাংকের নিজস্ব পদ্ধতি থাকতে পারে।
দ্বিতীয়ত, সব রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে। সার্কুলারে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন সংক্রান্ত রেকর্ড ব্যাংককে সংরক্ষণ করতে হবে। ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ হলে এই রেকর্ড কাজে লাগে।
তৃতীয়ত, কোম্পানির অ্যাকাউন্টস বিভাগকে এই নিয়ম সম্পর্কে সচেতন রাখতে হবে। প্রতিটি বড় চেক ইস্যুর সময় যেন সম্মতিপত্র পাঠানো হয়, সে বিষয়ে একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া তৈরি করা উচিত।
চেক জালিয়াতি কীভাবে হয় এবং পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন কীভাবে রক্ষা করে
চেক জালিয়াতি বাংলাদেশে একটি গুরুতর সমস্যা। সাধারণত নিচের পদ্ধতিতে এটি করা হয়:
- জাল চেক মুদ্রণ: আসল চেকের মতো নকল চেক তৈরি করা
- স্বাক্ষর জালিয়াতি: অন্যের স্বাক্ষর নকল করা
- MICR Line পরিবর্তন: চেকের নিচের ম্যাগনেটিক কোড পরিবর্তন করা
- টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি: ১০ হাজার টাকার চেককে ১০ লক্ষ টাকায় পরিণত করা
- প্রাপকের নাম পরিবর্তন: বৈধ প্রাপকের জায়গায় অন্য নাম বসানো
গ্রাহক সম্মতিপত্র এই সব জালিয়াতি রোধ করে। কারণ চেকের যেকোনো তথ্য পরিবর্তন হলে তা গ্রাহকের দেওয়া মূল তথ্যের সাথে মিলবে না। ফলে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেকটি আটকে দেবে।
FAQ
পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন হলো চেক ইস্যুকারীর পক্ষ থেকে ব্যাংককে দেওয়া একটি সম্মতিপত্র, যেখানে চেকের তারিখ, পরিমাণ ও প্রাপকের তথ্য আগেভাগে জানানো হয়। এটি চেক জালিয়াতি রোধ করে।
কর্পোরেট ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১ লক্ষ টাকা এবং ব্যক্তি হিসাবের ক্ষেত্রে ৫ লক্ষ টাকা ও তার বেশি মূল্যমানের চেকে পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন বাধ্যতামূলক।
সম্মতিপত্র না থাকলে Paying Bank “Advice not Received” কারণ দেখিয়ে চেকটি ফেরত দিতে পারে এবং লেনদেন সম্পন্ন হবে না।
প্রতিটি ব্যাংকের নির্ধারিত পদ্ধতিতে, সাধারণত ব্যাংকের ফর্ম, অনলাইন পোর্টাল বা ইমেইলের মাধ্যমে চেক ইস্যুর সময়ই গ্রাহক সম্মতিপত্র পাঠাতে হয়।
শেষকথা
পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন বা গ্রাহক সম্মতিপত্র বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় চেক জালিয়াতি রোধে একটি অত্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার উপরের সব চেকে এই সম্মতিপত্র দেওয়া বাধ্যতামূলক।
আপনি যদি একজন ব্যবসায়ী বা কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হন, তাহলে আজই আপনার ব্যাংকের সাথে যোগাযোগ করুন এবং পজিটিভ পে ইন্সট্রাকশন পাঠানোর সঠিক পদ্ধতিটি জেনে নিন। এটি শুধু নিয়ম মানার বিষয় নয়, এটি আপনার নিজের অর্থের সুরক্ষাও নিশ্চিত করে।
