সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার ‘আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে। এই নতুন অধ্যাদেশটি পূর্বের ‘ব্যাংক আমানত বীমা আইন, ২০০০’ এর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। যদি কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায় বা অবসায়িত হয়, তবে গ্রাহকরা কত টাকা ফেরত পাবেন তা এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে।
আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে সহজভাবে তুলে ধরা হলো:
ব্যাংক দেউলিয়া হলে গ্রাহক কত টাকা ফেরত পাবেন?
নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়িত হলে প্রত্যেক আমানতকারী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবেন।
- সুরক্ষিত টাকার পরিমাণ: যদিও অধ্যাদেশে ট্রাস্টি বোর্ডকে এই সীমা নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তবে বর্তমানে এই সীমা ২ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে (যা পূর্বে ১ লক্ষ টাকা ছিল)। অর্থাৎ, আপনার অ্যাকাউন্টে যত টাকাই থাকুক না কেন, ব্যাংক দেউলিয়া হলে আপনি সর্বোচ্চ ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন।
- ট্রাস্টি বোর্ডের ক্ষমতা: এই টাকার পরিমাণ ফিক্সড নয়। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ট্রাস্টি বোর্ড প্রতি ৩ বছরে অন্তত একবার এই সীমা পর্যালোচনা করে টাকার পরিমাণ পুননির্ধারণ করতে পারবে।
- অতিরিক্ত টাকা: আপনার জমানো টাকা যদি সুরক্ষা সীমার (২ লক্ষ টাকা) বেশি হয়, তবে বাকি টাকা পাওয়ার জন্য আপনাকে অবসায়কের (Liquidator) কাছে দাবি পেশ করতে হবে। ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাবে, সেখান থেকে আনুপাতিক হারে বাকি টাকা পরিশোধের চেষ্টা করা হবে।
কারা এই সুবিধা পাবেন? (সুরক্ষিত আমানতকারী)
এই অধ্যাদেশের আওতায় কেবল ব্যাংক নয়, ফাইন্যান্স কোম্পানি (আর্থিক প্রতিষ্ঠান)-এর গ্রাহকরাও এখন সুরক্ষার আওতায় আসবেন।
- ব্যাংক গ্রাহক: সকল তফসিলি ব্যাংকের গ্রাহক এই সুবিধা পাবেন।
- ফাইন্যান্স কোম্পানি গ্রাহক: ২০২৮ সালের ১ জুলাই থেকে ফাইন্যান্স কোম্পানির আমানতকারীরাও এই সুরক্ষার আওতায় আসবেন।
কোন আমানতগুলো সুরক্ষা পাবে না?
সকল আমানত এই বীমার আওতায় আসবে না। অধ্যাদেশ অনুযায়ী ‘সুরক্ষা বহির্ভূত আমানত’ গুলো হলো:
১. সরকারি আমানত: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সেগুলোর আওতাধীন দপ্তর ও সংস্থার আমানত ।
২. সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের আমানত ।
৩. রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, স্ব-শাসিত সংস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আমানত ।
৪. বিদেশি সরকারের আমানত ।
৫. বিদেশি সরকারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের আমানত ।
৬. আন্তর্জাতিক সংস্থার আমানত ।
৭. সদস্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আমানত: অর্থাৎ, কোনো ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানি যদি অন্য কোনো সদস্য প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখে ।
টাকা ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া ও তহবিল
গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে দুইটি পৃথক তহবিল গঠন করা হয়েছে:
- আমানত সুরক্ষা তহবিল (ব্যাংক কোম্পানি)।
- আমানত সুরক্ষা তহবিল (ফাইন্যান্স কোম্পানি)।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘আমানত সুরক্ষা বিভাগ’ এই তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীকে দ্রুত টাকা পরিশোধ নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করবে।
টাকা ফেরত পেতে কত দিন সময় লাগবে?
ব্যাংক দেউলিয়া বা অবসায়িত হওয়ার আদেশ প্রদানের তারিখ থেকে মোট ১৭ কার্যদিবসের মধ্যে আমানতকারীকে টাকা ফেরত দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
এই সময়সীমাটি দুটি ভাগে বিভক্ত:
- প্রথম ১০ দিন: ব্যাংক অবসায়নের আদেশ হওয়ার ১০ (দশ) কার্যদিবসের মধ্যে অবসায়ক (Liquidator) আমানতকারীদের তালিকা ও প্রাপ্য টাকার পরিমাণ ‘আমানত সুরক্ষা বিভাগ’-এর নিকট প্রেরণ করবেন।
- পরবর্তী ৭ দিন: অবসায়কের নিকট হতে উক্ত তালিকা প্রাপ্তির ৭ (সাত) কার্যদিবসের মধ্যে ‘আমানত সুরক্ষা বিভাগ’ আমানতকারীদের সুরক্ষিত আমানতের অর্থ পরিশোধ করবে।
অর্থাৎ, আইনি প্রক্রিয়া ও দাপ্তরিক কাজ সম্পন্ন করে আপনি সর্বোচ্চ ১৭ কার্যদিবসের মধ্যে আপনার প্রাপ্য টাকা ফেরত পাবেন।
টাকা কিভাবে ফেরত পাওয়া যাবে?
আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ এর ধারা ২৩, উপ-ধারা (৩) অনুযায়ী, আমানত সুরক্ষা বিভাগ আমানতকারীর টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য নিম্নলিখিত যেকোনো পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারে:
- ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে (Bank Account Transfer):
- টাকা সরাসরি আমানতকারীর অন্য কোনো তফসিলি ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানির অ্যাকাউন্টে ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এটিই সম্ভবত টাকা ফেরত পাওয়ার প্রধান ও দ্রুততম উপায়।
- অন্য কোনো উপায়ে (Other Means):
- আমানতকারীর কাছে টাকা দ্রুত পৌঁছানোর জন্য ‘আমানত সুরক্ষা বিভাগ’ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা সাপেক্ষে অন্য কোনো সুবিধাজনক উপায় ব্যবহার করতে পারবে। এর অর্থ হলো, পরিস্থিতি এবং প্রাপ্যতা অনুযায়ী তারা চেক বা মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) এর মতো মাধ্যমও ব্যবহার করতে পারে, যদি তা দ্রুত ও কার্যকর হয়।
শেষকথা
আমানত সুরক্ষা সংক্রান্ত সব নিয়ম, বিশেষ করে নমিনি বা জয়েন্ট অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধারাগুলি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এবং আপনার অধিকারগুলো সঠিকভাবে বুঝতে, আমরা আপনাকে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ‘আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর গেজেট কপিটি সম্পূর্ণ পড়ে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি।
সম্পূর্ণ অধ্যাদেশের কপিটি ডাউনলোড করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ভিজিট করুন:
আমানত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন
