কাস্টমস ব্যাগেজ বিধিমালা ২০২৫: বিদেশ থেকে পণ্য আনার নতুন নিয়ম

বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি অপর্যটক যাত্রী ব্যাগেজ বিধিমালা ২০২৪ রহিতকরণ করে নতুন ব্যাগেজ বিধিমালা (অপর্যটক যাত্রী ব্যাগেজ বিধিমালা, ২০২৫) প্রণয়ন করেছে। বিদেশ থেকে কী কী পণ্য আনা যাবে, কাস্টমস ঘোষণা পদ্ধতি এবং শুল্ক ও করের পরিমাণ এই বিধিমালায় বিস্তারিত উল্লেখ থাকে। নতুন ব্যাগেজ বিধিমালাটি পূর্বের ব্যাগেজ বিধিমালার প্রায় সকল নিয়মনীতি অপরিবর্তিত রাখলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সংশোধনী আনা হয়েছে। আজকের লেখায় আমরা নতুন ব্যাগেজ বিধিমালায় কী কী পরিবর্তন এসেছে, তা বিস্তারিত আলোচনা করব।

কাস্টমস ঘোষণাপত্র (তফসিল-১)

আগের নিয়ম: বিদেশ থেকে আগত সকল যাত্রীকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে পূরণকৃত ব্যাগেজ ঘোষণা ফরম জমা দিতে হতো। আন-অ্যাকোম্পানিড ব্যাগেজের ক্ষেত্রে কাস্টমস হল বা কাস্টমস এলাকা ছাড়ার আগেই ঘোষণা দিতে হতো। ভুলবশত বা অনিবার্য কারণে ঘোষণা দেওয়া সম্ভব না হলে, যাত্রীর আগমনের ৭ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার অব কাস্টমস-এর নিচে নন এমন কাস্টমস কর্মকর্তার কাছে তফসিল-১ অনুযায়ী ফরম পূরণ করে ঘোষণা দেওয়া যেত।

নতুন নিয়ম: এখন বিদেশ থেকে আগত সকল যাত্রীকে তফসিল-১ এ বর্ণিত ব্যাগেজ ঘোষণা ফরম পূরণ করে অথবা অনলাইনে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নিকট দাখিল করতে হবে। আন-অ্যাকোম্পানিড ব্যাগেজের ক্ষেত্রে কাস্টমস হল (Customs hall) বা কাস্টমস এলাকা ত্যাগ করার পূর্বেই যাত্রী কর্তৃক কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নিকট তফসিল-১ এ বর্ণিত ফরম পূরণ করে ব্যাগেজ ঘোষণা প্রদান করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, যদি ভুলবশত বা অনিবার্য কারণে ঘোষণা দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে সেই যাত্রীর আগমনের ৩০ দিনের মধ্যে (আগের ৭ দিনের পরিবর্তে) সংশ্লিষ্ট অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার অব কাস্টমস-এর নিচে নন এমন কাস্টমস কর্মকর্তার কাছে তফসিল-১ অনুযায়ী ফরম পূরণ করে ঘোষণা দেওয়া যাবে।

মোবাইল ফোন আমদানির নিয়মাবলী

আগের নিয়ম: একজন যাত্রী সর্বোচ্চ ২টি ব্যবহৃত মোবাইল ফোন শুল্ক ও কর পরিশোধ ব্যতিরেকে আমদানি করতে পারতেন। এছাড়াও, তফসিল-২ অনুযায়ী শুল্ক ও কর পরিশোধ সাপেক্ষে ১টি নতুন মোবাইল ফোন আনা যেত।

নতুন নিয়ম: নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, একজন যাত্রী সর্বোচ্চ ২টি ব্যবহৃত মোবাইল ফোন এবং প্রতি বছর ১টি নতুন মোবাইল ফোন শুল্ক ও কর পরিশোধ ব্যতিরেকে আমদানি করতে পারবেন। এর অতিরিক্ত মোবাইল ফোন আমদানির ক্ষেত্রে বিধি ১০ এবং অন্যান্য প্রচলিত বিধিবিধান প্রযোজ্য হবে। এই পরিবর্তন মোবাইল ফোন আমদানিতে কিছুটা কড়াকড়ি এনেছে, কারণ এখন প্রতি বছর মাত্র একটি নতুন ফোন শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে।

বৈদেশিক মুদ্রা ঘোষণার সীমা

আগের নিয়ম (তফসিল-১, প্রশ্ন ১০, উপধারা ঞ): যাত্রীকে ৫,০০০ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ অর্থের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ঘোষণা করতে হতো।

নতুন নিয়ম (তফসিল-১, প্রশ্ন ১০, উপধারা ঞ): বৈদেশিক মুদ্রা ঘোষণার সীমা বৃদ্ধি করে ১০,০০০ মার্কিন ডলার বা সমপরিমাণ অর্থ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে $১০,০০০ এর অধিক বৈদেশিক মুদ্রা থাকলে কাস্টমস হলে বৈদেশিক মুদ্রা ফরমে পৃথকভাবে ঘোষণা প্রদান করতে হবে। এটি যাত্রীদের জন্য একটি স্বস্তিদায়ক পরিবর্তন, কারণ এখন বেশি পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বহন করলে ঘোষণার প্রয়োজন হবে না।

স্বর্ণবার/স্বর্ণপিন্ড আমদানির শুল্ক

আগের নিয়ম (তফসিল-২, ক্রমিক ৭): স্বর্ণবার বা স্বর্ণপিন্ড (সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ তোলা) আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামের জন্য ৪০০০/- টাকা শুল্ক ও কর প্রযোজ্য ছিল।

নতুন নিয়ম (তফসিল-২, ক্রমিক ৬): স্বর্ণবার বা স্বর্ণপিন্ড (সর্বোচ্চ ১১৭ গ্রাম বা ১০ তোলা) আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ও কর বৃদ্ধি করে প্রতি ১১.৬৬৪ গ্রামের জন্য ৫০০০/- টাকা করা হয়েছে।

স্বর্ণালংকার এবং স্বর্ণ/রৌপ্যবার/পিন্ডের জন্য বার্ষিক সীমা

আগের নিয়ম: পুরাতন আইনে শুল্কমুক্ত গহনা এবং শুল্কযুক্ত বার/পিন্ড আমদানির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট বার্ষিক সীমার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল না।

নতুন নিয়ম: একটি নতুন বিধিনিষেধ যোগ করা হয়েছে যে, একজন যাত্রী স্বর্ণালংকার (১০০ গ্রাম স্বর্ণ বা ২০০ গ্রাম রৌপ্য পর্যন্ত) এবং স্বর্ণ/রৌপ্যবার/পিন্ড (১১৭ গ্রাম স্বর্ণ বা ২৩৪ গ্রাম রৌপ্য পর্যন্ত) প্রতি পঞ্জিকা বছরে একবার আমদানি করতে পারবেন। গহনার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ শুল্ক ও কর মুক্ত এবং বার/পিন্ডের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শুল্ক ও কর পরিশোধ সাপেক্ষে এই সুবিধা পাওয়া যাবে।

শুল্ক ও করমুক্ত পণ্যের তালিকা

আগের নিয়ম: পুরাতন আইনে ২৬ ধরনের পণ্য শুল্ক ব্যতিরেকে বিদেশ থেকে আনা যেত।

নতুন নিয়ম: নতুন আইনে সেই তালিকাটি সংকুচিত করে ১৯ ধরনের পণ্য বিদেশ থেকে আনয়নে শুল্কছাড় দেওয়া হয়েছে। নুতন আইন অনুযায়ী শুল্ক ও করমুক্ত পণ্যসমূহ হলো:

  • ১। ডেস্কটপ/ল্যাপটপ কম্পিউটার (একটি ইউপিএসসহ)
  • ২। কম্পিউটার স্ক্যানার
  • ৩। কম্পিউটার প্রিন্টার
  • ৪। ভিডিও ক্যামেরা (HD Cam, DV Cam, BETA Cam, DSLR, Mirrorless, Interchangeable lens এবং Professional কাজে ব্যবহৃত হয় এইরূপ ক্যামেরা ব্যতীত)
  • ৫। স্টিল ক্যামেরা/ডিজিটাল ক্যামেরা (DSLR, Mirrorless, Interchangeable lens ক্যামেরা ও Professional কাজে ব্যবহারযোগ্য ক্যামেরা ব্যতীত)
  • ৬। সাধারণ/ইলেকট্রিক ওভেন/মাইক্রোওয়েভ ওভেন
  • ৭। রাইস কুকার/প্রেসার কুকার/গ্যাস ওভেন (বার্নারসহ)
  • ৮। টোস্টার/স্যান্ডউইচ মেকার/ব্লেন্ডার/ফুড প্রসেসর/জুসার/কফি মেকার
  • ৯। গৃহস্থালি সেলাই মেশিন (ম্যানুয়াল/বৈদ্যুতিক)
  • ১০। টেবিল/প্যাডেস্টাল ফ্যান/গৃহস্থালি সিলিং ফ্যান
  • ১১। স্পোর্টস সরঞ্জাম (ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য)
  • ১২। ১ (এক) শত গ্রাম ওজনের স্বর্ণালংকার ও ২ (দুই) শত গ্রাম ওজনের রৌপ্য অলংকার (একই প্রকার অলংকার ১২টির অধিক হইবে না)
  • ১৩। ১ কার্টন (২০০ শলাকা) সিগারেট
  • ১৪। ২৯” পর্যন্ত Plasma, LCD, TFT, LED অনুরূপ প্রযুক্তির টেলিভিশন এবং Cathod Ray Tube (CRT) সাদাকালো/রঙ্গিন টেলিভিশন
  • ১৫। সাধারণ সিডি ও দুইটি স্পিকারসহ কম্পোনেন্ট (মিউজিক সেন্টার) (সিডি/ভিসিডি/ডিভিডি/এলডি/এমডি সেট)
  • ১৬। ৪ (চার) টি স্পিকারসহ কম্পোনেন্ট (মিউজিক সেন্টার) সিডি/ভিসিডি/ডিভিডি/এলডি/এমডি/ব্লু রেডিস্ক প্লেয়ার
  • ১৭। ২ (দুই) টি ব্যবহৃত মোবাইল/সেলুলার ফোন সেট
  • ১৮। ১ (এক) টি নূতন মোবাইল/সেলুলার ফোন সেট
  • ১৯। সর্বোচ্চ ১৫ বর্গমিটার আয়তন বিশিষ্ট একটি কার্পেট

উপসংহার

নতুন ব্যাগেজ বিধিমালা ২০২৫ বাংলাদেশের যাত্রীদের জন্য কিছু পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। কিছু ক্ষেত্রে সুবিধা বাড়ানো হয়েছে, যেমন বিলম্বিত ঘোষণা বা বৈদেশিক মুদ্রা বহনের সীমা, আবার কিছু ক্ষেত্রে কড়াকড়িও এসেছে, যেমন মোবাইল ফোন বা স্বর্ণ আমদানির ক্ষেত্রে। বিদেশ থেকে আসার আগে এই নতুন নিয়মাবলী সম্পর্কে জেনে রাখা আপনার জন্য একটি মসৃণ কাস্টমস অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। আপনারা যদি অপর্যটক যাত্রী ব্যাগেজ বিধিমালা ২০২৫ বিধিমালাটি ডাউনলোড করতে চান তাহলে এই লিংকে ক্লিক করুন

About The Author

Leave a Reply