বাবার রেখে যাওয়া জমির নামজারি করতে গিয়ে কি আপনি হয়রানির শিকার হচ্ছেন?
বণ্টননামা দলিল নেই—শুধুমাত্র এই অজুহাতে কি আপনার নামজারির আবেদনটি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে এই লেখাটি আপনার জন্যই।
আমাদের দেশে অনেকেই পৈতৃক বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির মালিকানা নিজের নামে করতে গিয়ে নানা বিভ্রান্তিতে পড়েন। বিশেষ করে ‘বণ্টননামা দলিল’ আর ‘ওয়ারিশ সনদ’ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে অনেক দ্বিধা কাজ করে। চলুন, সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী জেনে নিই উত্তরাধিকার সম্পত্তির নামজারির একদম সঠিক এবং সহজ নিয়মটি।
উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত জমির নামজারি করার উপায়
ওয়ারিশ বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির মালিকদের নামজারি প্রধানত দুইটি ভিন্ন উপায়ে হতে পারে। আপনার কোনটি প্রয়োজন, তার ওপর ভিত্তি করে কাগজপত্রের চাহিদাও বদলে যাবে।
১. যৌথভাবে নামজারি (বণ্টননামা দলিল ছাড়া)
মৃত ব্যক্তির সকল ওয়ারিশ যদি চান যে তাদের সবার নাম একটি মাত্র খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত থাকুক, তবে তারা যৌথভাবে নামজারির আবেদন করতে পারেন।
- কী কী লাগবে: এক্ষেত্রে কোনো বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কমিশনারের কাছ থেকে একটি ‘ওয়ারিশ সনদ’ সংগ্রহ করে জমা দিলেই হবে।
- প্রক্রিয়া: আবেদন পাওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) একটি নামজারি খতিয়ান তৈরি করে দেবেন। সেখানে মৃত ব্যক্তির মোট জমির মধ্যে কোন ওয়ারিশের কতটুকু প্রাপ্য হিস্যা বা অংশ রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে।
২. আলাদা খতিয়ান বা জমাভাগ (বণ্টননামা দলিল আবশ্যক)
ওয়ারিশগণ যদি চান যে প্রত্যেকে নিজেদের অংশ আলাদা করে নিয়ে পৃথক পৃথক খতিয়ান তৈরি করবেন এবং আলাদাভাবে ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) দেবেন, তবে পদ্ধতিটি ভিন্ন হবে।
- কী কী লাগবে: এই ক্ষেত্রে একটি ‘আপোষ বণ্টননামা দলিল’ করা বাধ্যতামূলক। সকল ওয়ারিশ মিলে কে কোন দাগের কতটুকু জমি ভোগদখল করবেন, তা নির্ধারণ করে এই দলিলটি সম্পাদন ও রেজিস্ট্রি করতে হবে।
- প্রক্রিয়া: রেজিস্ট্রিকৃত বণ্টননামা দলিল ব্যবহার করে ওয়ারিশগণ পৃথক নামজারির আবেদন করলে, প্রত্যেকের নামে আলাদা খতিয়ান তৈরি করে দেওয়া হবে।
নামজারির আবেদন কেন বাতিল হচ্ছে এবং সরকারি নির্দেশনা কী?
সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, অনেক নাগরিক ওয়ারিশ সনদ দিয়ে যৌথ নামজারির আবেদন করলেও তা নামঞ্জুর বা বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে, বণ্টননামা দলিল নেই। এটি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এর ফলে সাধারণ মানুষ চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
সরকারি পরিপত্রে এই বিষয়টি একদম স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে:
- বণ্টননামা ছাড়াই যৌথ খতিয়ান বৈধ: শুধু ওয়ারিশ সনদ দিয়ে সকল উত্তরাধিকারীর নামে তাদের হিস্যা উল্লেখ করে যৌথ খতিয়ান তৈরি করা সম্পূর্ণ আইনসিদ্ধ। এর জন্য কোনোভাবেই আবেদন বাতিল করা যাবে না।
- রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০: এই আইনের ১৪৩নং উপধারা অনুযায়ী, পূর্বের খতিয়ান (মৃত ব্যক্তির নামে থাকা খতিয়ান) ভেঙে যদি ওয়ারিশদের নামে পৃথক পৃথক খতিয়ান (জমাভাগ) তৈরি করতে হয়, কেবলমাত্র তখনই বণ্টননামা দলিল আবশ্যক।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ওয়ারিশ সনদ দিয়ে কি জমির নামজারি করা যায়? হ্যাঁ, যায়। মৃত ব্যক্তির সকল উত্তরাধিকারী যদি একসাথে যৌথ খতিয়ানের জন্য আবেদন করেন, তবে কেবল একটি বৈধ ওয়ারিশ সনদ দিয়েই নামজারি করা সম্ভব।
২. আপোষ বণ্টননামা দলিল কখন করতে হয়? যখন ওয়ারিশরা নিজেদের জমি আলাদা করে নিতে চান এবং প্রত্যেকের নামে পৃথক খতিয়ান তৈরি করে আলাদা খাজনা দিতে চান, তখন রেজিস্ট্রিকৃত আপোষ বণ্টননামা দলিল করতে হয়।
৩. সহকারী কমিশনার (ভূমি) কি বণ্টননামা ছাড়া যৌথ নামজারির আবেদন বাতিল করতে পারবেন? না। সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী, ওয়ারিশগণ যৌথভাবে নামজারির আবেদন করলে বণ্টননামা দলিল না থাকার অজুহাতে সেই আবেদন কোনোভাবেই বাতিল বা নামঞ্জুর করা যাবে না।
পরবর্তী পদক্ষেপ
জমিজমা সংক্রান্ত সঠিক তথ্য না জানার কারণে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। উত্তরাধিকার সম্পত্তির নামজারির এই সঠিক নিয়মটি আপনার পরিচিতদের সাথে শেয়ার করে তাদের সচেতন করুন। আপনার নিজের জমির নামজারি নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানাতে পারেন, অথবা সরাসরি আপনার নিকটস্থ ভূমি অফিসে যোগাযোগ করে আপনার আবেদনটি দ্রুত সম্পন্ন করে নিন।
