সংশোধিত রিটার্ন কখন ও কিভাবে করবেন?

রিটার্ন দাখিলের পর ভুল ধরা পড়লে অনেকেই দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করার সুযোগ আইনেই রাখা হয়েছে।

আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী, কোনো করদাতা মূল রিটার্ন জমার পর যদি ভুল তথ্য বা বাদ পড়া আয় খুঁজে পান, তিনি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেই রিটার্ন সংশোধন করতে পারবেন। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় সংশোধিত রিটার্ন বা Revised Return।

বাস্তবে দেখা যায়, অনেক করদাতা ব্যাংক সুদ, বাড়িভাড়া বা বিনিয়োগ আয় ভুলে রিটার্নে না দিয়েই জমা করেন। পরে সেই ভুল ধরা পড়লে সংশোধনের প্রয়োজন হয়। আবার কখনো হিসাবের গণিতে ছোট ভুলও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব:

  • সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের আইনি ভিত্তি কী
  • কোন শর্তে এই সুযোগ পাওয়া যায়
  • অনলাইন ও ম্যানুয়াল, দুটো পদ্ধতিই কিভাবে কাজ করে
  • কোন কোন ক্ষেত্রে সংশোধন করা যাবে না

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়লে আপনি নিজেই সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন, কোনো বিশেষজ্ঞের সাহায্য ছাড়াই।

সংশোধিত রিটার্ন দাখিল কী এবং কেন প্রয়োজন হয়?

সংশোধিত রিটার্ন দাখিল মানে হলো মূল রিটার্ন জমার পর কোনো ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্য সংশোধন করে নতুন করে রিটার্ন জমা দেওয়া। এটি করদাতার একটি আইনি অধিকার, যা আয়কর আইন ২০২৩-এ স্বীকৃত।

বাস্তবে বিভিন্ন কারণে এই প্রয়োজন হতে পারে। যেমন ব্যাংকের সুদ আয় ভুলে বাদ পড়ে যাওয়া, বাড়িভাড়া আয় সঠিকভাবে না দেখানো, করছাড়ের হিসাবে ভুল বা কোনো সম্পদ তালিকায় বাদ যাওয়া।

তবে মনে রাখবেন, সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং শর্ত আছে। এই শর্তগুলো মানলে তবেই এই সুযোগ মিলবে।

আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১৮০: সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের মূল ভিত্তি

সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিধানটি হলো ধারা ১৮০। এই ধারা অনুযায়ী, একজন করদাতা নিজ উদ্যোগে তার মূল রিটার্ন সংশোধন করতে পারবেন।

ধারা ১৮০(২) অনুযায়ী মূল রিটার্ন দাখিলের পর যদি করদাতা বুঝতে পারেন যে আয়, কর অব্যাহতি বা প্রদেয় করের হিসাবে কোনো ভুল হয়েছে, তাহলে লিখিত বিবৃতিতে কারণ উল্লেখ করে তিনি সংশোধিত রিটার্ন জমা দিতে পারবেন।

এই ধারাটি আসলে করদাতার পক্ষে। কারণ স্বেচ্ছায় ভুল সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হলে রাজস্ব ফাঁকির ঝুঁকি কমে এবং করদাতাও আইনি ঝামেলা থেকে বাঁচেন।

সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের শর্তাবলি – কখন এই সুযোগ পাবেন না?

ধারা ১৮০(৩) অনুযায়ী, নিচের তিনটি ক্ষেত্রে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করা যাবে না।

১. ১৮০ দিনের সময়সীমা পার হলে মূল রিটার্ন জমার তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধন করতে হবে। এই সময় পেরিয়ে গেলে স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে আর সংশোধন সম্ভব নয়।

২. আগেই একবার সংশোধন করা হয়ে থাকলে একটি মূল রিটার্নের জন্য মাত্র একবারই সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সুযোগ মেলে। দ্বিতীয়বার এই সুযোগ নেই।

৩. রিটার্নটি অডিটের জন্য নির্বাচিত হলে যদি ইতিমধ্যে রিটার্নটি ধারা ১৮২-এর অধীনে অডিটের জন্য বাছাই হয়ে যায়, তাহলে স্বউদ্যোগে সংশোধন করা যাবে না। এক্ষেত্রে অডিট প্রক্রিয়াতেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে।

এই শর্তগুলো আগে থেকেই জেনে রাখা ভালো, তাহলে সঠিক সময়ে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন।

ধারা ১৭৫: অতিরিক্ত কর পরিশোধের বিধান

সংশোধিত রিটার্নে যদি দেখা যায় যে আগের তুলনায় বেশি কর প্রদেয় হচ্ছে, তবে ধারা ১৭৫(২) অনুযায়ী রিটার্ন জমার আগেই সেই অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হবে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ধারা ১৭৫(৪) অনুযায়ী সংশোধিত রিটার্নে কোনোভাবেই আগের রিটার্নের তুলনায় করদায় কমানো যাবে না। অর্থাৎ সংশোধন শুধু বেশি কর দেওয়ার জন্য করা যাবে, কম করের দাবিতে নয়।

এই বিধানটি জানা না থাকলে অনেকে ভুল ধারণায় সংশোধনের চেষ্টা করেন। তাই সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের আগে নিশ্চিত হয়ে নিন যে করদায় কমানোর জন্য আপনি এটি করছেন না।

সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতি

যেসকল করদাতা অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন তারা অনলাইনেই তাদের সংশোধনী রিটার্ন (Revise Return) দাখিল করতে পারবেন, তবে প্রাথমিক রিটার্ন দাখিলের তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করতে হবে। আর ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল করেছেন তাদের ক্ষেত্রে অনলাইনে সংশোধনী রিটার্ন দাখিলের সুযোগ নেই। তাদেরকে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতেই সংশোধনী রিটার্ন দাখিল করতে হবে। এছাড়াও রিটার্ন প্রসেস পর্যায়ে ও অডিট পর্যায়ে সংশোধনী রিটার্ন দাখিল করা যায়। সংশোধনী রিটার্ন দাখিলের সকল পদ্ধতি সম্পর্কেই আলোচনা করা হলো:

অনলাইনে সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতি (ই-রিটার্ন)

বর্তমানে অনলাইনে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল সবচেয়ে সহজ ও দ্রুত পদ্ধতি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ই-রিটার্ন পোর্টালে এই সুবিধা পাওয়া যায়। তবে যারা অনলাইনে রিটার্ন দাখিল করেছেন, শুধুমাত্র তারাই এই সুযোগটি পাবেন। ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াটি নিচে দেওয়া হলো:

১. লগইন করুন: আপনার ই-রিটার্ন অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করুন।

২. সংশোধিত রিটার্ন অপশন নির্বাচন করুন: সিস্টেম ড্যাশবোর্ডের বাম পাশে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৮০ দিনের সীমার মধ্যে Revised Return অপশন দেখাবে।

৩. তথ্য সংশোধন করুন: বাদ পড়া আয় যোগ করুন বা ভুল তথ্য ঠিক করুন।

৪. কর পরিশোধ করুন: অতিরিক্ত কর থাকলে অনলাইনে এ-চালানের (A-Challan) মাধ্যমে পরিশোধ করুন।

৫. সাবমিট করুন: সব তথ্য যাচাই করে রিটার্নটি জমা দিন।

    অনলাইনে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করলে সার্কেল অফিসে যেতে হয় না, সময় ও খরচ দুটোই বাঁচে।

    ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল (সার্কেল অফিস)

    যারা ম্যানুয়ালী রিটার্ন দাখিল করেছেন, তারা বর্তমানে অনলাইনে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন না। তাদের জন্য ম্যানুয়াল পদ্ধতি রয়েছে। এই পদ্ধতিতে সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের ধাপগুলো হলো:

    ১. আবেদনপত্র তৈরি করুন: একটি লিখিত Forwarding Letter লিখুন। এতে উল্লেখ করুন মূল রিটার্নের তারিখ, রসিদ নম্বর এবং সংশোধনের সুনির্দিষ্ট কারণ।

    ২. নতুন রিটার্ন ফর্ম পূরণ করুন: সংশোধিত তথ্যাদি দিয়ে নতুন ফর্ম পূরণ করুন। ফর্মের উপরে স্পষ্টভাবে “সংশোধিত রিটার্ন” বা “Revised Return” লিখতে ভুলবেন না।

    ৩. অতিরিক্ত কর জমা দিন: সংশোধনের কারণে বেশি কর আসলে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জমা দিন। চালানের কপি রিটার্নের সাথে সংযুক্ত করুন।

    ৪. সার্কেল অফিসে জমা দিন: আপনার কর অঞ্চলের সার্কেলে উপকর কমিশনার (DCT) বরাবর সব কাগজপত্র জমা দিন।

    ৫. প্রাপ্তি স্বীকারপত্র রাখুন: জমা দেওয়ার পর Acknowledgement সংগ্রহ করতে ভুলবেন না। এটি ভবিষ্যতে প্রমাণ হিসেবে কাজে আসবে।

      রিটার্ন প্রসেস পর্যায়ে সংশোধন – ধারা ১৮১

      কখনো কখনো উপকর কমিশনার নিজেই রিটার্ন প্রসেস করার সময় গাণিতিক ভুল বা অসঙ্গতি ধরতে পারেন। সেক্ষেত্রে ধারা ১৮১(২) অনুযায়ী তিনি করদাতাকে লিখিত নোটিশ পাঠান।

      এই নোটিশ পেলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। নোটিশে উল্লিখিত সময়ের মধ্যে পার্থক্য নিরসন করে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করুন এবং প্রয়োজনীয় কর পরিশোধ করুন। এই পদ্ধতিটি আসলে করদাতার জন্যই সুবিধাজনক, কারণ কর বিভাগ নিজেই আপনাকে সংশোধনের সুযোগ দিচ্ছে।

      অডিট পর্যায়ে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল – ধারা ১৮২

      যদি রিটার্নটি অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়, তাহলে অডিট সম্পন্ন হওয়ার পর উপকর কমিশনার একটি অডিট প্রতিবেদনসহ নোটিশ পাঠান।

      ধারা ১৮২(৫) অনুযায়ী করদাতাকে অডিট ফলাফলের ভিত্তিতে প্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা ও প্রমাণাদিসহ একটি সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এই সংশোধিত রিটার্ন গ্রহণযোগ্য হলে উপকর কমিশনার গ্রহণপত্র পাঠান এবং অডিট নিষ্পত্তি হয়। তাই অডিট নোটিশ পেলে দেরি না করে দ্রুত সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের প্রস্তুতি নিন।

      সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের জন্য করদাতাকে সংশোধনের কারণ উল্লেখ করে একটি লিখিত বিবৃতি দাখিল করতে হবে।

      কতদিনের মধ্যে ভুল-সংশোধনী রিটার্ন (Revise Return) জমা দিতে হবে?

      প্রাথমিক রিটার্ন দাখিলের তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

      কখন সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করা যাবে না

      নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে সংশোধিত রিটার্ন  দাখিল  করা  যাবে  না:
      • প্রাথমিক রিটার্ন দাখিলের ১৮০ দিন পর: মূল রিটার্ন দাখিলের ১৮০ দিন শেষ হওয়ার পর সংশোধন করা যাবে না।
      • একবার সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের পর: শুধুমাত্র একবার সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করা যায়।
      • মূল রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর: ধারা ১৮২ অনুযায়ী অডিটের জন্য নির্বাচিত হলে সংশোধন করা যাবে না।

      সংশোধিত রিটার্ন দাখিলে সাধারণ ভুলগুলো এড়িয়ে চলুন

      সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করতে গিয়ে অনেকেই কিছু সাধারণ ভুল করেন। এগুলো জেনে রাখলে সমস্যা এড়ানো সহজ হবে।

      • প্রাপ্তি স্বীকারপত্র না রাখা: এটি ভবিষ্যতের যেকোনো বিরোধে প্রমাণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
      • সময়মতো দাখিল না করা: ১৮০ দিনের সময়সীমা ভুলে যাওয়া সবচেয়ে বড় ভুল।
      • ফর্মে “সংশোধিত রিটার্ন” না লেখা: এটি লেখা না থাকলে মূল রিটার্ন হিসেবে প্রসেস হয়ে যেতে পারে।
      • আগে কর পরিশোধ না করা: অতিরিক্ত কর জমার আগেই রিটার্ন জমা দিলে সমস্যা হয়।
      • কারণ উল্লেখ না করা: আবেদনপত্রে সংশোধনের কারণ স্পষ্টভাবে না লিখলে প্রত্যাখ্যান হতে পারে।

      FAQ

      প্রশ্ন ১: সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা কতদিন?

      মূল রিটার্ন দাখিলের তারিখ থেকে ১৮০ (একশত আশি) দিনের মধ্যে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করতে হবে। এই সময় পেরিয়ে গেলে আর স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে সংশোধনের সুযোগ থাকে না।

      প্রশ্ন ২: সংশোধিত রিটার্নে কি করদায় কমানো যাবে?

      না, কোনোভাবেই সংশোধিত রিটার্নে আগের রিটার্নের তুলনায় করদায় (Tax Liability) কমানো যাবে না। আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১৭৫(৪) অনুযায়ী এটি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ।

      প্রশ্ন ৩: একই রিটার্নের জন্য কতবার সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করা যায়?

      একটি মূল রিটার্নের জন্য মাত্র একবারই সংশোধিত রিটার্ন দাখিলের সুযোগ আছে। আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ১৮০(৩) অনুযায়ী, একবার সংশোধিত রিটার্ন দাখিল হয়ে গেলে দ্বিতীয়বার আর এই সুযোগ পাওয়া যাবে না।

      উপসংহার

      সংশোধিত রিটার্ন দাখিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুবিধা যা সচেতন করদাতাদের ভুল সংশোধনের সুযোগ দেয়। তবে এই সুবিধা পেতে হলে নির্দিষ্ট শর্ত ও সময়সীমা মেনে চলতে হবে।

      মূল বিষয়গুলো মনে রাখুন, মূল রিটার্নের ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধন করতে হবে, মাত্র একবারই এই সুযোগ পাবেন এবং অতিরিক্ত কর থাকলে আগেই পরিশোধ করতে হবে। অনলাইনে ই-রিটার্ন পোর্টালের মাধ্যমে খুব সহজেই সংশোধিত রিটার্ন দাখিল করা সম্ভব।

      এদিকে, সঠিক সময়ে সংশোধিত রিটার্ন দাখিল না করলে ভবিষ্যতে জরিমানা বা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে। তাই দেরি না করে যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নিন। কোনো জটিলতা মনে হলে আপনার কর অঞ্চলের সার্কেল অফিসে যোগাযোগ করুন অথবা একজন অভিজ্ঞ কর পরামর্শদাতার সাহায্য নিন।

      About The Author

      Leave a Reply