প্রিপেইড মিটার কোড হলো এমন কিছু সংখ্যা যা মিটারে চাপ দিলে স্ক্রিনে বিভিন্ন তথ্য দেখা যায়, যেমন ব্যালেন্স, টোকেন হিস্টরি বা অ্যালার্ম। এই লেখায় প্রিপেইড মিটার কোডের তালিকা ও তাদের অর্থ বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ ডিজিটাল বিদ্যুৎ মিটারে এখন প্রিপেইড সিস্টেম চালু আছে। গ্রাহকরা প্রায়ই জানতে চান, মিটারে কোন কোড দিলে কী তথ্য পাওয়া যায়। এই গাইডে ক্যাটাগরি অনুযায়ী প্রতিটি কোড সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে সহজে খুঁজে নিতে পারেন।
প্রিপেইড মিটার কোড কী এবং কেন প্রয়োজন
প্রিপেইড মিটার কোড মূলত মিটারের ভেতরে থাকা একটি ডেটাবেজের সংক্ষিপ্ত রেফারেন্স নম্বর। প্রতিটি কোড একটি নির্দিষ্ট তথ্যের সাথে যুক্ত থাকে। কোড চাপলে মিটারের স্ক্রিনে সেই তথ্য প্রদর্শিত হয়। গ্রাহকরা নিজে থেকেই ব্যালেন্স, বিদ্যুৎ খরচ বা টোকেন ইতিহাস দেখতে পারেন, যা কর্তৃপক্ষের অফিসে না গিয়ে অনেক সময় বাঁচায়।
মিটার কোম্পানি অনুযায়ী কোডের সংখ্যা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। তবে বেশিরভাগ স্মার্ট প্রিপেইড মিটারে একই ধরনের কাঠামো অনুসরণ করা হয়। তাই একটি সাধারণ প্রিপেইড মিটার কোড লিস্ট জানা থাকলে যেকোনো মিটারে সহজে কাজ করা যায়।
প্রিপেইড মিটার কোড কিভাবে দেখবেন
প্রিপেইড মিটার কোড দেখার পদ্ধতি খুবই সহজ। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করলে যেকোনো কোড চেক করা যায়।
- মিটারের কিপ্যাডে গিয়ে পছন্দের কোড নম্বর টাইপ করুন।
- এন্টার বা এন্টার বাটনে চাপ দিন।
- স্ক্রিনে কিছুক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট তথ্য প্রদর্শিত হবে।
- প্রয়োজনে পরবর্তী কোড টাইপ করে আবার এন্টার দিন।
মিটারের সব বাটন সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা তা আগে যাচাই করে নেওয়া ভালো। প্রিপেইড মিটার কোড টাইপ করার সময় ভুল হলে মিটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিসেট হয়ে যায়।
এনার্জি সংক্রান্ত প্রিপেইড মিটার কোড লিস্ট
বিদ্যুৎ খরচের হিসাব জানার জন্য এনার্জি ক্যাটাগরির কোডগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই প্রিপেইড মিটার কোড গুলো মাসিক ও দৈনিক খরচের তথ্য দেখায়।
- ৮০০ – মোট পজিটিভ সক্রিয় এনার্জি
- ৮১৩ – গতকালের মোট সক্রিয় এনার্জি
- ৮১৪ – চলতি মাসের মোট সক্রিয় এনার্জি
- ৮২০ থেকে ৮২৫ – গত ছয় মাসের এনার্জি খরচ ধাপে ধাপে
- ৯২২ থেকে ৯২৮ – চলতি ও গত ছয় মাসের খরচের পরিমাণ (টাকায়)
মিটার তথ্য দেখার প্রিপেইড মিটার কোড
মিটারের সাধারণ তথ্য জানার জন্য বেশ কিছু কোড রয়েছে। এগুলো সিরিয়াল নম্বর, তারিখ ও স্ট্যাটাস দেখতে ব্যবহৃত হয়।
- ৮০১ – মিটারের অবশিষ্ট ব্যালেন্স
- ৮০২ – বর্তমান তারিখ
- ৮০৩ – বর্তমান সময়
- ৮০৪ – মিটারের সিরিয়াল নম্বর
- ৮০৫ – এসজিসি নম্বর
- ৮০৭ – মিটার স্ট্যাটাস ওয়ার্ড
এই প্রিপেইড মিটার কোড গুলো ব্যবহার করে মিটারের সঠিক সময় ও তারিখ মিলিয়ে নেওয়া যায়, যা রিচার্জ ইতিহাস বোঝার জন্য জরুরি।
অ্যালার্ম ও এলার্ট সংক্রান্ত প্রিপেইড মিটার কোড
ব্যালেন্স কমে গেলে বা ইমার্জেন্সি অবস্থায় মিটার অ্যালার্ম বাজায়। এই সংক্রান্ত কোডগুলো নিচে দেওয়া হলো।
- Any – শব্দ করা অ্যালার্ম বন্ধ করা
- ০ – ইমার্জেন্সি ওভারড্রাফট সক্রিয় আছে কিনা তা দেখায়
- ৮১০ – ইমার্জেন্সি ওভারড্রাফট লিমিট
- ৮১১ – সক্রিয় ইমার্জেন্সি ওভারড্রাফট
- ৯১৭, ৯১৮, ৯১৯ – ব্যালেন্স কম থাকার লেভেল ১, ২ ও ৩ অ্যালার্ম
ব্যালেন্স কম থাকার প্রিপেইড মিটার কোড দেখে গ্রাহক আগেভাগেই রিচার্জ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে হঠাৎ বিদ্যুৎ বন্ধ হওয়ার সমস্যা এড়ানো যায়।
রিলে ও টোকেন সংক্রান্ত প্রিপেইড মিটার কোড
রিলে হলো মিটারের সেই অংশ যা সংযোগ চালু বা বন্ধ করে। আর টোকেন কোড রিচার্জ সংক্রান্ত ইতিহাস দেখায়।
রিলে সংক্রান্ত কোড
- ৮০৬ – রিলে অপারেশনের কারণ
- ৮৬৮ – রিলে টেস্টিং
- ৮৯২ – রিলে সংযোগের সংখ্যা
- ৮৯৩ – রিলে বিচ্ছিন্নের সংখ্যা
টোকেন সংক্রান্ত কোড
- ৮৩০ থেকে ৮৩৯ – সর্বশেষ দশবারের রিচার্জ টোকেন কোড
- ৮৮৯ – বর্তমান টোকেন সিকোয়েন্স নম্বর
- ৮৯০ – টোকেন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সংখ্যা
- ৮৯১ – টোকেন গ্রহণ হওয়ার সংখ্যা
প্রিপেইড মিটার কোড ব্যবহার করে পুরনো টোকেন হিস্টরি চেক করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় বিরোধ মেটানোর সময়। কোনো রিচার্জ সঠিকভাবে যুক্ত না হলে এই কোডগুলো সহায়ক হয়।
ট্যারিফ ও স্টেপ সংক্রান্ত প্রিপেইড মিটার কোড
বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে বাড়ে। প্রতিটি ধাপের ইউনিট ও দাম জানতে নিচের কোডগুলো ব্যবহার করা হয়।
- ৯০১ থেকে ৯০৭ – প্রতিটি ধাপের কিলোওয়াট আওয়ার
- ৯০৮ থেকে ৯১৫ – প্রতিটি ধাপের মূল্য
- ৮৮৬ – বর্তমান টিওইউ ট্যারিফের দাম
- ৮৮৭ – বর্তমান স্টেপ ট্যারিফ
এই প্রিপেইড মিটার কোড গুলো জানা থাকলে মাস শেষে বিলের হিসাব নিজে নিজেই যাচাই করা যায়। ফলে ভুল বিলিং হলে সহজে ধরা পড়ে।
ফ্রেন্ডলি মোড ও অন্যান্য প্রিপেইড মিটার কোড
কিছু মিটারে ফ্রেন্ডলি মোড নামে একটি বিশেষ সুবিধা থাকে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ে ব্যালেন্স শূন্য হলেও সংযোগ চালু থাকে।
- ৮৯৫ – ফ্রেন্ডলি মোডে অনুমোদিত দিন সংখ্যা
- ৮৯৬ – ইতিমধ্যে ব্যবহৃত দিন সংখ্যা
- ৮৯৭ ও ৮৯৮ – ফ্রেন্ডলি সময়ের শুরু ও শেষ
- ৯০০ – ফ্রেন্ডলি মোডের স্ট্যাটাস
পাওয়ার, ভোল্টেজ ও কারেন্ট সংক্রান্ত তথ্যের জন্যও আলাদা কোড রয়েছে, যেমন ৮৭০ থেকে ৮৭৯ পর্যন্ত ফেজ ভোল্টেজ, কারেন্ট ও পাওয়ার দেখায়। রিঅ্যাকটিভ এনার্জি সংক্রান্ত তথ্যের জন্য ৯৪০ থেকে ৯৭৪ পর্যন্ত কোডগুলো ব্যবহার করা হয়।
প্রিপেইড মিটার কোড ব্যবহারের সময় সতর্কতা
কোড ব্যবহারের আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। ভুল কোড দিলে মিটার সাময়িকভাবে লক হয়ে যেতে পারে।
- সঠিক নম্বর টাইপ করার আগে নিশ্চিত হয়ে নিন
- মিটারে খুব দ্রুত পরপর অনেক কোড না দেওয়াই ভালো
- সমস্যা হলে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করুন
নিয়মিত প্রিপেইড মিটার কোড চেক করার অভ্যাস থাকলে অপ্রত্যাশিত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এড়ানো সহজ হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রিপেইড মিটার কোড দিয়ে ব্যালেন্স কিভাবে দেখব
মিটারে ৮০১ কোড টাইপ করে এন্টার দিলে বর্তমান ব্যালেন্স স্ক্রিনে দেখা যায়। এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রিপেইড মিটার কোড। প্রতিদিন একবার চেক করলে খরচের ধারণা পাওয়া যায়।
প্রিপেইড মিটার কোডের তালিকা কোথায় পাওয়া যায়
এই আর্টিকেলে ক্যাটাগরি অনুযায়ী সম্পূর্ণ প্রিপেইড মিটার কোড লিস্ট দেওয়া আছে। এছাড়া মিটার কোম্পানির ম্যানুয়াল বইতেও তালিকা থাকে। স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিস থেকেও তালিকা সংগ্রহ করা যায়।
ভুল প্রিপেইড মিটার কোড দিলে কী হয়
ভুল কোড দিলে সাধারণত মিটার কোনো তথ্য দেখায় না বা এরর মেসেজ দেখায়। বারবার ভুল কোড দিলে মিটার সাময়িকভাবে লক হতে পারে। এমন হলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার চেষ্টা করুন।
টোকেন হিস্টরি দেখতে কোন প্রিপেইড মিটার কোড ব্যবহার করব
সর্বশেষ রিচার্জের টোকেন দেখতে ৮৩০ কোড ব্যবহার করুন। আগের রিচার্জগুলো ৮৩১ থেকে ৮৩৯ পর্যন্ত কোডে ধারাবাহিকভাবে পাওয়া যায়। বিরোধ মেটানোর সময় এই কোডগুলো প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগে।
মিটারের সময় ও তারিখ ঠিক আছে কিনা কিভাবে বুঝব
৮০২ কোড দিলে বর্তমান তারিখ এবং ৮০৩ কোড দিলে বর্তমান সময় দেখা যায়। এই দুটি প্রিপেইড মিটার কোড মিলিয়ে দেখলে মিটারের ঘড়ি সঠিক আছে কিনা বোঝা যায়।
উপসংহার
প্রিপেইড মিটার কোড জানা থাকলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রতিটি তথ্য নিজে থেকেই চেক করা সম্ভব। ব্যালেন্স, এনার্জি খরচ, টোকেন হিস্টরি এবং অ্যালার্মের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এই কোডের মাধ্যমে সহজে পাওয়া যায়। উপরের সম্পূর্ণ প্রিপেইড মিটার কোড লিস্ট থেকে প্রয়োজনীয় কোডটি বেছে নিয়ে নিয়মিত মিটার চেক করুন, যাতে বিদ্যুৎ সংক্রান্ত কোনো সমস্যা আগেভাগেই ধরা পড়ে।
