আয়বর্ষ ও করবর্ষ কী?

আয়বর্ষ ও করবর্ষ নিয়ে এই বিভ্রান্তি খুব সাধারণ, এমনকি অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের মধ্যেও দেখা যায়। ভুল বছর লিখলে রিটার্ন গ্রহণে জটিলতা হতে পারে। এছাড়া কর হিসাবেও গোলমাল বাধে। তাই শুরুতেই বিষয়টি পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো।

এই লেখায় আমরা আয়কর আইনের সংজ্ঞা সহজ ভাষায় ভেঙে বুঝব। এরপর দুইয়ের পার্থক্য একটি ছোট টেবিলে দেখব। তারপর বাস্তব উদাহরণ, বিশেষ ক্ষেত্রের নিয়ম আর সাধারণ ভুলগুলো নিয়ে কথা বলব। লেখা শেষে আশা করি আপনার আর কোনো প্রশ্ন বাকি থাকবে না।

আয়বর্ষ ও করবর্ষ সংক্ষেপে কী?

একটি সহজ কথা দিয়ে শুরু করা যাক। আয়বর্ষ হলো সেই বছর, যে বছরে আপনি আয় করেছেন। অন্যদিকে করবর্ষ হলো সেই বছর, যে বছরে ওই আয়ের ওপর কর নির্ধারণ হয়।

অর্থাৎ আগে আয় হয়, পরে কর হিসাব হয়। তাই আয়বর্ষ সবসময় করবর্ষের ঠিক আগে আসে। সাধারণভাবে বললে, করবর্ষ = আয়বর্ষের পরের বছর।

একটি ছোট উদাহরণ দেখুন। আপনি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বেতন পেয়েছেন। এটি আপনার আয়বর্ষ। এই আয়ের কর হিসাব হবে পরবর্তী করবর্ষে, অর্থাৎ ২০২৬ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া বছরে।

আয়বর্ষ কাকে বলে?

আয়কর আইনে বলা আছে, আয়বর্ষ হলো করবর্ষের অব্যবহিত পূর্ববর্তী অর্থবৎসর। “অব্যবহিত” মানে একদম পাশের, মাঝখানে কোনো ফাঁক নেই।

সাধারণ নিয়মে আয়বর্ষ চলে ১ জুলাই থেকে পরবর্তী ৩০ জুন পর্যন্ত। এই সময়ের মধ্যে আপনি যা আয় করেন, তার সবই ওই আয়বর্ষের হিসাবে ধরা হয়। চাকরির বেতন, ভাড়া, ব্যবসার মুনাফা কিংবা ব্যাংকের সুদ, সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত।

লক্ষ করুন, আইন আয়বর্ষকে শুধু একটি স্থির তারিখে বেঁধে রাখেনি। কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে আয়বর্ষ ১২ মাসের চেয়ে ছোট হতে পারে। সেই ক্ষেত্রগুলো আমরা নিচে আলাদা করে দেখব।

করবর্ষ কাকে বলে?

আইন অনুযায়ী করবর্ষ অর্থ প্রত্যেক বৎসর জুলাই মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু করে ১২ মাস মেয়াদ। এছাড়া আইনের বিধান অনুযায়ী করবর্ষ হিসাবে গণ্য অন্য কোনো মেয়াদও এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

করবর্ষের সময়সীমা সবসময় ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন। এখানে আয়বর্ষের মতো বাড়তি ব্যতিক্রম নেই। তাই করবর্ষ মনে রাখা তুলনামূলক সহজ।

করবর্ষেই আপনি আগের বছরের আয়ের রিটার্ন জমা দেন। এই বছরেই কর নির্ধারণের কাজও হয়। অনেকে ভুল করে ভাবেন, করবর্ষে যে আয় হচ্ছে তারই কর দিচ্ছেন। আসলে ব্যাপারটি উল্টো। আপনি আগের বছরের আয়ের কর দিচ্ছেন।

আয়বর্ষ ও করবর্ষের পার্থক্য এক নজরে

নিচের টেবিলে দুটির মূল পার্থক্য দেওয়া হলো।

বিষয়আয়বর্ষকরবর্ষ
সংজ্ঞাযে বছরে আয় হয়েছেযে বছরে ওই আয়ের কর নির্ধারিত হয়
সময়সাধারণত ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন১ জুলাই থেকে ১২ মাস
কাজআয় অর্জনের সময়কালরিটার্ন ও কর নির্ধারণের সময়কাল
ব্যতিক্রমআছে (নতুন ব্যবসা, বন্ধ ব্যবসা, ব্যাংক ইত্যাদি)সাধারণত নেই
ক্রমআগে আসেপরে আসে
উদাহরণ২০২৫-২৬২০২৬-২৭

এই টেবিল মনে রাখলেই আয়বর্ষ ও করবর্ষের পার্থক্য অনেকটাই পরিষ্কার হয়ে যাবে। মূল সূত্র একটাই: আয়বর্ষে আয়, করবর্ষে কর।

উদাহরণ দিয়ে আয়বর্ষ ও করবর্ষ বুঝুন

নিয়ম পড়ার চেয়ে উদাহরণে বোঝা সহজ। তাই কয়েকটি বাস্তব পরিস্থিতি দেখা যাক।

উদাহরণ ১: একজন চাকরিজীবী

করিম সাহেব একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তিনি বেতন পেয়েছেন। তাঁর আয়বর্ষ হবে ২০২৫-২৬। এই আয়ের জন্য করবর্ষ হবে ২০২৬-২৭। রিটার্নে তিনি আয়বর্ষ ২০২৫-২৬ এবং করবর্ষ ২০২৬-২৭ লিখবেন।

উদাহরণ ২: নতুন ব্যবসা শুরু

রুমানা ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর একটি অনলাইন দোকান চালু করেছেন। তাঁর প্রথম আয়বর্ষ শুরু হয়েছে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ থেকে। এটি চলবে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত। মানে এই বছর তাঁর আয়বর্ষ পুরো ১২ মাসের নয়, প্রায় সাড়ে নয় মাসের। তবে করবর্ষ নিয়ম অনুযায়ী ২০২৬-২৭ই থাকবে।

উদাহরণ ৩: নতুন আয়ের উৎস

ধরুন, জামাল সাহেব সারা বছর চাকরি করেন। ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর থেকে তিনি একটি ফ্ল্যাট ভাড়া দিতে শুরু করলেন। এটি তাঁর জন্য নতুন আয়। আইন অনুযায়ী এই নতুন আয়ের আয়বর্ষ শুরু হবে ১ অক্টোবর ২০২৫ থেকে এবং শেষ হবে ৩০ জুন ২০২৬।

উদাহরণ ৪: ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে

একটি দোকান ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর বন্ধ হয়ে গেল। এক্ষেত্রে আয়বর্ষ হবে ১ জুলাই ২০২৫ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত। তাই ওই ব্যবসার হিসাব শুধু ছয় মাসের জন্য ধরা হবে।

পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও একটি জিনিস একই থাকে। আয়বর্ষ শেষ হওয়ার পরের করবর্ষেই কর নির্ধারণ হয়।

কোন কোন ক্ষেত্রে আয়বর্ষ আলাদা হয়?

আইনে আয়বর্ষের কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্র উল্লেখ আছে। সেগুলো সহজ ভাষায় নিচে দেওয়া হলো।

  • নতুন ব্যবসা: ব্যবসা প্রথম শুরুর তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ জুন পর্যন্ত।
  • নতুন আয়ের উদ্ভব: যেদিন নতুন আয় শুরু হয়েছে, সেদিন থেকে পরবর্তী ৩০ জুন পর্যন্ত।
  • ব্যবসা সমাপ্তি, সংস্থার বিলুপ্তি বা কোম্পানির অবসান: ১ জুলাই থেকে ওই সমাপ্তি, বিলুপ্তি বা অবসানের তারিখ পর্যন্ত।
  • অংশীদারের অবসর বা মৃত্যু: অনিগমিত সংস্থার (যেমন অংশীদারি ফার্ম) ক্ষেত্রে ১ জুলাই থেকে ওই অংশীদারের অবসর বা মৃত্যুর তারিখ পর্যন্ত। এরপর অবশিষ্ট সময়ের জন্য আয়বর্ষ আলাদাভাবে গণনা হয়।
  • ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান: সংশ্লিষ্ট বছরের ১ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী ১২ মাস। অর্থাৎ এদের আয়বর্ষ সাধারণত জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর।

সব বিশেষ ক্ষেত্র মনে রাখার দরকার নেই। শুধু এটুকু জানুন যে আপনার পরিস্থিতি সাধারণ না হলে আয়বর্ষ ভিন্ন হতে পারে।

বিদেশি কোম্পানির জন্য বিশেষ সুযোগ

আইনে একটি শর্তও আছে, যা বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের বাইরে নিগমিত কোনো মূল কোম্পানির সহযোগী কোম্পানি, হোল্ডিং কোম্পানি, ব্রাঞ্চ, রিপ্রেজেন্টেটিভ বা লিয়াজোঁ অফিস নিজেদের হিসাব মূল কোম্পানির সঙ্গে মেলাতে চাইতে পারে।

এমন হলে তারা ভিন্ন আয়বর্ষ অনুসরণের অভিপ্রায় জানাতে পারে। তবে এর জন্য উপকর কমিশনারের অনুমোদন লাগবে। অনুমোদন পেলে পৃথক ১২ মাস আয়বর্ষ হিসাবে গণ্য হতে পারে। এই সুবিধা সবার জন্য নয়, শুধু ওই নির্দিষ্ট ধরনের কোম্পানির জন্য।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

আয়বর্ষ কী?

আয়বর্ষ হলো করবর্ষের ঠিক আগের অর্থবছর, যে সময়ে আপনি আয় করেছেন। সাধারণ ক্ষেত্রে এটি ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত।

করবর্ষ কী?

করবর্ষ হলো প্রতি বছর ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ১২ মাসের মেয়াদ। এই সময়ে আগের আয়বর্ষের আয়ের ওপর কর নির্ধারণ ও রিটার্ন দাখিল হয়।

নতুন ব্যবসা শুরু করলে আয়বর্ষ কখন থেকে ধরা হয়?

ব্যবসা শুরুর তারিখ থেকে পরবর্তী ৩০ জুন পর্যন্ত প্রথম আয়বর্ষ ধরা হয়। এটি পুরো ১২ মাসের নাও হতে পারে।

ব্যাংকের আয়বর্ষ কী?

ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে আয়বর্ষ সংশ্লিষ্ট বছরের ১ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী ১২ মাস।

উপসংহার

আয়বর্ষ ও করবর্ষ আলাদা দুটি সময়কাল। আয়বর্ষে আপনি আয় করেন, আর পরবর্তী করবর্ষে সেই আয়ের কর নির্ধারণ হয়। সাধারণ নিয়মে আয়বর্ষ ও করবর্ষ দুটিই জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত চলে। তবে নতুন ব্যবসা, ব্যবসা বন্ধ, অংশীদারের অবসর কিংবা ব্যাংক ও বিমার মতো ক্ষেত্রে আয়বর্ষ ভিন্ন হতে পারে।

নিজের পরিস্থিতি জটিল মনে হলে একজন কর পরামর্শক বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সঙ্গে কথা বলে নিন। আর লেখাটি উপকারী মনে হলে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করুন এবং আমাদের সাইটের অন্যান্য কর-বিষয়ক গাইডগুলোও পড়ে দেখুন।

About The Author

Leave a Reply