কিভাবে আমদানি আগাম কর সমন্বয় করা যায়?

বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য আমদানি পরবর্তী আগাম কর সমন্বয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে মূসক পরিশোধ পদ্ধতি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নতুন নির্দেশনা (সাধারণ আদেশ নং ৬/মূসক/২০২৫) জারি করেছে। এই আদেশ ১৫ জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ (৩১ আষাঢ়, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ) তারিখে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে 1 । এটি মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ৩১ এর উপ-ধারা (৩) ও (৩ক) এবং মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা, ২০১৬ এর বিধি ১৯ ও বিধি ১১৮ক এর ক্ষমতাবলে জারি করা হয়েছে । এই আদেশটি ১ জুলাই, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ তারিখে জারীকৃত সাধারণ আদেশ নং-০৪/মূসক/২০২৫ রহিত করে অবিলম্বে কার্যকর হবে।  

আগাম কর সমন্বয়ের সাধারণ নিয়ম

প্রত্যেক নিবন্ধিত আমদানিকারক, যিনি আগাম কর পরিশোধ করেছেন, তিনি নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট কর মেয়াদ বা তৎপরবর্তী ছয়টি কর মেয়াদের মধ্যে মূসক দাখিলপত্রে পরিশোধিত আগাম করের সমপরিমাণ অর্থ হ্রাসকারী সমন্বয় হিসেবে গ্রহণ করতে পারবেন ।

বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য বিশেষ পদ্ধতি (যখন মূল্য সংযোজন ৫০% এর অধিক নয়)

যখন আপনি বিদেশ থেকে কোনো পণ্য আমদানি করেন, তখন আমদানি পর্যায়ে আপনাকে ৭.৫% হারে আগাম কর দিতে হয়। এখন প্রশ্ন হলো, এই আগাম কর কীভাবে সমন্বয় করবেন?

নিয়ম হলো:

  • আপনি যদি নিবন্ধিত আমদানিকারক হন এবং আগাম কর পরিশোধ করেন, তাহলে সেই কর আপনি পরবর্তী ৬টি কর মেয়াদের মধ্যে দাখিলপত্রে সমন্বয় করতে পারবেন।
  • দাখিলপত্র (মূসক-৯.১) এর নোট-২২ (আমদানির তথ্য) এবং নোট-৩২ (হ্রাসকারী সমন্বয়) অংশে সঠিকভাবে তথ্য এন্ট্রি করতে হবে।

উদাহরণ

ধরুন, একজন বাণিজ্যিক আমদানিকারক বিদেশ থেকে ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ১০০ কেজি পণ্য আমদানি করলেন।

  • আমদানি পর্যায়ে প্রতি কেজির ভিত্তিমূল্য ছিল ২০০ টাকা
  • সে অনুযায়ী, ৭.৫% হারে প্রদত্ত আগাম কর ছিল ১৫ টাকা (৭.৫% × ২০০)

এখন তিনি বাজার বিশ্লেষণ করে বুঝলেন যে, এই পণ্যের স্থানীয় পর্যায়ের মূল্য সংযোজন ৫০% এর বেশি হবে না। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যে তিনি আইন অনুযায়ী আগাম করকে চূড়ান্ত বিবেচনায় এনে Final Settlement পদ্ধতিতে সরবরাহ করবেন।

🔄 প্রথম ধাপের বিক্রয়:

  • প্রথম চালানে তিনি ২০ কেজি পণ্য সরবরাহ করলেন
  • স্থানীয় সরবরাহমূল্য নির্ধারণ করলেন ৪০ টাকা/কেজি
  • অর্থাৎ মোট বিক্রয়মূল্য = ২০ × ৪০ = ৮০০ টাকা

এখানে, ৭.৫% হারে আগাম কর = ৮০০ × ৭.৫% = ৩ টাকা

✅ কর চালানপত্র প্রস্তুতি:

এই সরবরাহের জন্য তিনি একটি মূসক-৬.৩ ফরমে কর চালানপত্র ইস্যু করেন। চালানপত্রে তিনি—

  • কলাম ১০-এ মূসকের পরিমাণ হিসেবে ৩ টাকা উল্লেখ করেন
  • অন্যান্য কলাম স্বাভাবিক নিয়মে পূরণ করেন
  • চালানপত্রে স্পষ্টভাবে লিখেন:
    "আইনের ধারা ৩১(৩ক) অনুসারে আমদানিকালে আগাম কর পরিশোধিত"
    (এই অংশটি সীল/প্রিন্ট/হাতে লিখে উল্লেখযোগ্যভাবে দিতে হয়)

🔁 পরবর্তী বিক্রয়সমূহ:

  • যতবার তিনি ওই আমদানিকৃত পণ্যের অংশিক বিক্রয় করবেন, প্রতিবার চালানপত্র ইস্যু করতে হবে
  • প্রতিটি চালানে উক্ত নিয়মে ৭.৫% হারে মূসক (যা আগাম কর হিসেবে পরিশোধিত হয়েছে) উল্লেখ করতে হবে

বিকল্পভাবে, যদি তিনি একবারেই পুরো ১০০ কেজি পণ্য সরবরাহ করেন, তাহলে পুরো আগাম করের (যেমন ১৫ টাকা) বিবরণ একক চালানপত্রের কলাম ১০-এ দিতে হবে।

স্থানীয় পর্যায়ে মূসক পরিশোধের নিয়ম

মূল্য সংযোজনের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে স্থানীয় পর্যায়ে মূসক পরিশোধের নিয়ম পরিবর্তিত হয়। নিচে দুটি প্রধান অবস্থার ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:

অবস্থা ১: মূল্য সংযোজন ৫০% বা কম হলে

যদি আপনি আমদানিকৃত পণ্যের ওপর স্থানীয় পর্যায়ে ৫০% বা কম হারে মূল্য সংযোজন করেন, তাহলে:

১. আপনাকে মূসক পরিশোধ করতে হবে না

২. কিন্তু আপনাকে অবশ্যই চালানপত্র (মূসক-৬.৩) ইস্যু করতে হবে

৩. চালানপত্রে নিচের তথ্যগুলো লিখতে হবে:

  • আমদানির ঘোষণাপত্র নম্বর ও তারিখ
  • কাস্টমস স্টেশনের নাম
  • পণ্যের বিবরণ ও এইচ এস কোড
  • একটি স্পষ্ট ঘোষণা:
    “আইনের ধারা ৩১(৩ক) অনুসারে আমদানিকালে আগাম কর পরিশোধিত”

    এই পদ্ধতিতে আপনি মূসক রেয়াত নিতে পারবেন না এবং আগাম কর সমন্বয় করাও যাবে না।

    অবস্থা ২: মূল্য সংযোজন ৫০% এর বেশি হলে

    এই ক্ষেত্রে দুটি পদ্ধতির যেকোনো একটি আপনি বেছে নিতে পারবেন:

    ১. রেয়াতি পদ্ধতি (১৫% হারে)

    • আপনি ১৫% হারে মূসক পরিশোধ করবেন
    • এরপর আপনি:
      • মূসক রেয়াত গ্রহণ করতে পারবেন
      • ৭.৫% আগাম কর হ্রাসকারী সমন্বয় হিসেবে নিতে পারবেন

    ২. হ্রাসকৃত হারে মূসক (৭.৫%)

    • এই পদ্ধতিতে আপনি ৭.৫% হারে মূসক পরিশোধ করবেন
    • শুধুমাত্র আগাম কর হ্রাসকারী সমন্বয় গ্রহণযোগ্য হবে
    • মূসক রেয়াত গ্রহণযোগ্য নয়

    কিভাবে কর দাখিল ও অর্থ জমা করবেন?

    ধারা ৬৮ ও ৬৯ অনুযায়ী ফেরতের জন্য নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে:

    • নির্ধারিত ই-চালান কোডে অর্থ জমা দিন
    • ই-চালানের মূল কপি দাখিলপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করুন

    যদি আপনার প্রদেয় কর ঋণাত্মক (নেগেটিভ) হয়, তবে আপনি ফেরতের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

    অতিরিক্ত নির্দেশনা

    • যদি আমদানিকৃত পণ্যে মূসক অব্যাহতি থাকে, তাহলে আগাম কর ছয়টি মেয়াদের মধ্যে সমন্বয়যোগ্য
    • কেন্দ্রীয় নিবন্ধিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে মূসক-৬.৫মূসক-৬.৩ ফরম একসঙ্গে ব্যবহার করতে হবে

    প্রথম বিক্রয়কারী যদি ১৫% হারে মূসক পরিশোধ করে, তবে পরবর্তী ক্রেতা রেয়াত গ্রহণ করতে পারবেন

    শেষকথা

    বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্য নতুন মূসক নির্দেশনা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটি কর পরিশোধের পদ্ধতি সহজ করেছে এবং আগাম কর ব্যবস্থাপনার একটি স্পষ্ট রূপরেখা দিয়েছে। সঠিক ফরম পূরণ, নিয়মিত রিটার্ন দাখিল এবং মূল্য সংযোজনের হিসাব রাখার মাধ্যমে আপনি সহজেই এই সুবিধাগুলো নিতে পারবেন।

    About The Author

    Leave a Reply