আপনি কি একজন ফ্রিল্যান্সার এবং বিদেশ থেকে আয়ের টাকা দেশে আনতে গিয়ে নানা জটিলতায় পড়েছেন? তাহলে আপনার জন্য এসেছে দারুণ একটি সুখবর। ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সংক্রান্ত নিয়মকানুন এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২২ জুলাই ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট থেকে জারি করা এক নতুন সার্কুলারে ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তি পর্যায়ের সেবা রপ্তানিকারকদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক প্রমাণের ভিত্তিতে আয় দেশে আনা, ছোট অঙ্কের রেমিট্যান্সে সহজীকরণ, ডুয়াল-কারেন্সি ফ্রিল্যান্সার কার্ড এবং বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের সুযোগ, সবকিছু নিয়েই বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এই সার্কুলারে।
আমরা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করবো নতুন এই নিয়মগুলো ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বাস্তবে কী অর্থ বহন করে এবং এর ফলে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে। তাই পুরো আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সংক্রান্ত সার্কুলারের মূল উদ্দেশ্য কী
দেশের ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল সেবা রপ্তানি খাতকে আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে এই সার্কুলার জারি করা হয়েছে। আগে ফ্রিল্যান্সারদের আয়ের অর্থ দেশে আনতে গিয়ে প্রচলিত রপ্তানি নথির প্রয়োজন হতো, যা অনেক সময় ঝামেলাপূর্ণ ছিল।
ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সংক্রান্ত এই নতুন নির্দেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নিয়ম একত্র করে সহজ একটি কাঠামো তৈরি করেছে। এর ফলে আনুষ্ঠানিক রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইলেকট্রনিক প্রমাণের ভিত্তিতে আয় দেশে আনার সুযোগ
আগে পণ্য রপ্তানির মতো ফ্রিল্যান্সারদেরও EXP ফর্মসহ নানা কাগজপত্র জমা দিতে হতো। কিন্তু নতুন নিয়মে ইন্টারনেট বা ডিজিটাল মাধ্যমে প্রদত্ত সেবার ক্ষেত্রে এই ধরনের প্রচলিত রপ্তানি প্রক্রিয়া প্রযোজ্য হবে না।
এখন থেকে ফ্রিল্যান্সাররা প্ল্যাটফর্ম স্টেটমেন্ট, ইমেইল, ইনভয়েস এবং অন্যান্য ডিজিটাল যোগাযোগকে প্রমাণ হিসেবে দেখিয়ে বিদেশি ক্রেতা বা প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রাপ্ত আয় দেশে আনতে পারবেন। ব্যাংক এসব ডিজিটাল প্রমাণ যাচাই করেই টাকা ক্রেডিট করে দেবে।
ক্ষুদ্র অঙ্কের রেমিট্যান্স গ্রহণে সহজীকরণ
ছোট অঙ্কের বৈদেশিক লেনদেনকে আরও সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে। নিচের পয়েন্টগুলো লক্ষ্য করুন:
- সর্বোচ্চ ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র বা ফরম-সি ছাড়াই গ্রহণ করা যাবে
- এই সীমার বেশি অঙ্কের লেনদেনে অনলাইন ফরম-সি (আইসিটি) জমা দিতে হবে
- অনুমোদিত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সার্ভিস প্রোভাইডার (ওপিজিএসপি)-এর মাধ্যমে প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত অর্থ গ্রহণ করা যাবে
এই সুবিধার ফলে ছোট পরিসরে কাজ করা ফ্রিল্যান্সাররা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
ডুয়াল-কারেন্সি ফ্রিল্যান্সার কার্ড ও অন্যান্য পেমেন্ট মাধ্যম
ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ করতে ব্যাংকগুলোকে ডুয়াল-কারেন্সি ফ্রিল্যান্সার কার্ড ইস্যু করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই কার্ডের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সাররা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারবেন।
এছাড়া মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রোভাইডার এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের মাধ্যমেও লেনদেনের সুযোগ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ফলে ফ্রিল্যান্সাররা তাদের সুবিধামতো মাধ্যম বেছে নিয়ে আয়ের অর্থ দেশে আনতে পারবেন।
এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটায় বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের সুযোগ
নতুন নিয়মে ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো বৈদেশিক মুদ্রা সংরক্ষণের সুযোগ। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সাররা তাদের আয়ের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা বা ইআরকিউ হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রায় সংরক্ষণ করতে পারবেন।
অন্যদিকে, অন্যান্য সেবা রপ্তানিকারকদের ক্ষেত্রে এই সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ শতাংশ। এই সংরক্ষিত অর্থ বিদেশ ভ্রমণ, সফটওয়্যার রেজিস্ট্রেশন, ডোমেইন হোস্টিং ফি, সার্ভার মেইনটেন্যান্স এবং যন্ত্রপাতি আমদানির মতো বৈধ খরচে ব্যবহার করা যাবে।
কর ও নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে নির্দেশনা
ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন সংক্রান্ত এই সুবিধার পাশাপাশি কিছু বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কর কর্তন ও পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে সব লেনদেন KYC ও AML/CFT মান মেনে সম্পন্ন করতে হবে।
এছাড়া বিদেশে কোনো ধরনের বৈদেশিক মুদ্রা আয় জমা রাখা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব আয় দেশে ফেরত আনতে হবে, নাহলে তা ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
২০ হাজার ডলার পর্যন্ত লেনদেনে ফরম-সি জমা লাগবে না, তবে এর বেশি অঙ্কের জন্য অনলাইন ফরম-সি জমা দিতে হবে।
আইসিটি খাতের ফ্রিল্যান্সাররা ৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য সেবা রপ্তানিকারকরা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সংরক্ষণ করতে পারবেন।
সর্বোচ্চ ১০ হাজার মার্কিন ডলার গ্রহণ করা যাবে প্রতি লেনদেনে।
না, অনুমোদিত ব্যবস্থা ছাড়া বিদেশে আয় জমা রাখা ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে
শেষকথা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন এই সার্কুলার দেশের ফ্রিল্যান্সিং খাতের জন্য একটি বড় ইতিবাচক পদক্ষেপ। ফ্রিল্যান্সারদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ, দ্রুত এবং স্বচ্ছ হয়ে উঠবে। ইলেকট্রনিক প্রমাণের ভিত্তিতে আয় গ্রহণ, ফ্রিল্যান্সার কার্ড, এবং ইআরকিউ সুবিধা মিলিয়ে ফ্রিল্যান্সাররা এখন আরও নমনীয়ভাবে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন।
আপনি যদি একজন ফ্রিল্যান্সার হন, তাহলে এই নিয়মগুলো ভালোভাবে জেনে রাখা আপনার জন্য অত্যন্ত জরুরি। এতে আপনি আপনার আয় আরও সহজে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে দেশে আনতে পারবেন।
