অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ে ভ্যাট কত?

ই-কমার্স ও মার্কেটপ্লেসে ভ্যাট ২০২৬ নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) একটি গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ আদেশ জারি করেছে। ৭ জুন ২০২৬ তারিখে জারি করা এই আদেশ অনুযায়ী, বাংলাদেশে অনলাইনে পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান ও মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারীদের ভ্যাট পরিশোধের নিয়মে বড় পরিবর্তন এসেছে।

আপনি যদি Daraz, Chaldal বা Facebook-এ পণ্য বিক্রি করেন, অথবা নিজেই একটি অনলাইন শপ চালান, তাহলে এই আদেশ সরাসরি আপনার ব্যবসাকে প্রভাবিত করবে। এই লেখায় আমরা সহজ ভাষায় ও বাস্তব উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেব, নতুন নিয়মে আপনাকে ঠিক কতটুকু ভ্যাট দিতে হবে এবং কোন ক্ষেত্রে দিতে হবে না।

অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ে ভ্যাট নিয়ম ২০২৬

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সাধারণ আদেশ নং-০৫/মূসক/২০২৬-এর মাধ্যমে অনলাইন পণ্য বিক্রয় সেবার উপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আদায় সংক্রান্ত বিস্তারিত নির্দেশনা প্রদান করেছে। এটি মূলত ২০১৯ সালের একটি পুরনো ব্যাখ্যাপত্রের পরিবর্তে জারি করা হয়েছে। নতুন আদেশে অনলাইন পণ্য বিক্রয়কে দুটি আলাদা শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এই দুটি শ্রেণির জন্য ভ্যাটের নিয়মও আলাদা।

প্রথম শ্রেণি হলো অনলাইন খুচরা বিক্রেতা এবং দ্বিতীয় শ্রেণি হলো মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারী। এই দুটি ধরনের ব্যবসার মধ্যে পার্থক্য বোঝাটাই হলো নতুন নিয়ম বোঝার মূল চাবিকাঠি।

অনলাইন খুচরা বিক্রেতা কারা এবং তাদের ভ্যাটের নিয়ম কী?

অনলাইন খুচরা বিক্রেতা বলতে বোঝায় সেই প্রতিষ্ঠান যারা নিজেরা সরাসরি পণ্য কিনে, সেটি নিজেদের ওয়েবসাইট বা অ্যাপের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে বিক্রি করে। এদের নিজস্ব কোনো ফিজিক্যাল বিক্রয়কেন্দ্র নেই।

উদাহরণ দিয়ে বুঝি: ধরুন “আলো শপ” নামের একটি অনলাইন প্রতিষ্ঠান একটি ব্লেন্ডার ৫,০০০ টাকায় কিনেছে এবং উৎপাদনকারীকে ভ্যাটসহ দাম পরিশোধ করেছে। এখন আলো শপ যদি সেই ব্লেন্ডার একই ৫,০০০ টাকায় অনলাইনে গ্রাহককে বিক্রি করে, তাহলে তাকে পুনরায় সম্পূর্ণ পণ্যমূল্যের উপর ভ্যাট দিতে হবে না। কারণ সরবরাহ চেইনে আগেই ভ্যাট পরিশোধিত হয়েছে। তবে আলো শপকে প্রমাণ হিসেবে মূসক চালানের কপি নিজের কাছে রাখতে হবে।

অনলাইন পণ্য বিক্রয় সেবার ভ্যাট ২০২৬ অনুযায়ী, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের ভ্যাটের হার হলো ৭.৫% (তৃতীয় তফসিল অনুযায়ী ব্যবসায়ী পর্যায়ে)। চাইলে তারা ১৫% হারেও ভ্যাট দিতে পারবেন।

অনলাইন খুচরা বিক্রেতাদের জন্য ইনপুট-আউটপুট সহগ (মূসক-৪.৩) কি বাধ্যতামূলক?

না। নতুন আদেশে স্পষ্ট করা হয়েছে যে অনলাইন খুচরা পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ইনপুট-আউটপুট সহগ ঘোষণা (মূসক-৪.৩) দাখিল বাধ্যতামূলক নয়। কারণ এই ধরনের প্রতিষ্ঠান অসংখ্য পণ্য বিক্রি করে থাকে এবং প্রতিটি পণ্যের জন্য আলাদাভাবে এই ঘোষণা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন।

মার্কেটপ্লেস কী এবং তাদের ভ্যাটের নিয়ম কীভাবে আলাদা?

মার্কেটপ্লেস হলো একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিভিন্ন বিক্রেতা তাদের পণ্যের তথ্য দেয় এবং ক্রেতারা সেখান থেকে কেনাকাটা করেন। মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারী নিজে কোনো পণ্য কেনেন না বা বেচেন না। তারা শুধু বিক্রেতা ও ক্রেতার মধ্যে মাধ্যম হিসেবে কাজ করেন।

উদাহরণ: Daraz বাংলাদেশে একটি মার্কেটপ্লেস। এখানে হাজার হাজার বিক্রেতা তাদের পণ্য লিস্ট করেন এবং Daraz নিজে পণ্যের মালিক নয়। Daraz শুধু প্ল্যাটফর্ম সুবিধার বিনিময়ে কমিশন বা সার্ভিস চার্জ নেয়।

নতুন নিয়মে, ই-কমার্স ও মার্কেটপ্লেসে ভ্যাট ২০২৬ অনুযায়ী মার্কেটপ্লেসকে শুধুমাত্র তার প্রাপ্ত সার্ভিস ফি বা কমিশনের উপর ১৫% হারে ভ্যাট দিতে হবে। পুরো পণ্যমূল্যের উপর নয়।

মার্কেটপ্লেসে ভ্যাটের বাস্তব উদাহরণ

ধরুন একজন বিক্রেতা একটি মার্কেটপ্লেসে ১০,০০০ টাকার জুতা বিক্রি করলেন। মার্কেটপ্লেস সেই বিক্রয় সম্পন্ন করার জন্য ৫% কমিশন নেয়, অর্থাৎ ৫০০ টাকা। এক্ষেত্রে মার্কেটপ্লেসকে শুধু ওই ৫০০ টাকার উপর ১৫% হারে ৭৫ টাকা ভ্যাট দিতে হবে। ১০,০০০ টাকার উপর নয়।

এটি একটি ন্যায্য ব্যবস্থা, কারণ পণ্যটি মার্কেটপ্লেসের নিজের নয়। তারা শুধু সেবা দিচ্ছে, পণ্য নয়।

ভ্যাটমুক্ত পণ্য বিক্রিতেও কি মার্কেটপ্লেসের ভ্যাট লাগবে?

এটি অনেকের মনে সংশয় তৈরি করে। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, একটি মার্কেটপ্লেস শাকসবজি, মাছ বা চাল ডেলিভারি দিচ্ছে। এই পণ্যগুলো সাধারণত প্রথম তফসিল অনুযায়ী ভ্যাটমুক্ত

কিন্তু ই-কমার্স ও মার্কেটপ্লেসে ভ্যাট ২০২৬-এর নতুন নিয়মে পরিষ্কার বলা হয়েছে, পণ্যটি ভ্যাটমুক্ত হলেও মার্কেটপ্লেসের সার্ভিস ফি বা কমিশন কিন্তু ভ্যাটমুক্ত নয়। কারণ মার্কেটপ্লেস একটি অনলাইন সেবা দিচ্ছে এবং সেই সেবা ভ্যাটের আওতাভুক্ত।

  • পণ্য: শাকসবজি (ভ্যাটমুক্ত)
  • মার্কেটপ্লেসের সার্ভিস ফি: ভ্যাটযোগ্য (১৫% হারে)
  • অর্থাৎ, গ্রাহক থেকে নেওয়া কমিশনের উপর মার্কেটপ্লেসকে ভ্যাট দিতে হবে

মার্কেটপ্লেসকে কি মূসক চালান রাখতে হবে?

মার্কেটপ্লেসকে পণ্য বিক্রয়ে মূসক চালান রাখতে হবে না। যেহেতু মার্কেটপ্লেস নিজে পণ্য কেনে না বা বেঁচে না, তাই তাদের মূসক চালান বা ট্রেজারি চালানের কপি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা নেই। তবে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কর্মকর্তার চাহিদামতো মার্কেটপ্লেসকে তাদের প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত লেনদেনের তথ্য সরবরাহ করতে আইনত বাধ্য থাকতে হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

অনলাইন খুচরা বিক্রেতার ভ্যাট হার কত?

অনলাইন খুচরা বিক্রেতার ভ্যাটের হার তৃতীয় তফসিল অনুযায়ী ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৭.৫%। তবে ইচ্ছা করলে কোনো নিবন্ধিত ব্যক্তি ১৫% হারেও ভ্যাট পরিশোধ করতে পারেন। মূল বিষয় হলো উৎপাদনকারী বা সরবরাহকারী থেকে পণ্য কেনার সময় যদি ভ্যাট আগেই পরিশোধ হয়ে থাকে, তাহলে একই পণ্যের উপর পুনরায় সম্পূর্ণ ভ্যাট দিতে হবে না।

Daraz বা Chaldal-এর মতো মার্কেটপ্লেসকে কীভাবে ভ্যাট দিতে হয়?

Daraz বা Chaldal-এর মতো মার্কেটপ্লেসকে পুরো পণ্যমূল্যের উপর ভ্যাট দিতে হয় না। তারা শুধু বিক্রেতার কাছ থেকে যে কমিশন বা সার্ভিস চার্জ নেয়, সেই পরিমাণের উপর ১৫% হারে ভ্যাট পরিশোধ করলেই যথেষ্ট।

মাছ বা সবজি অনলাইনে বিক্রি করলে কি ভ্যাট লাগবে?

পণ্যটি ভ্যাটমুক্ত হলেও মার্কেটপ্লেসের সার্ভিস ফি ভ্যাটমুক্ত নয়। অর্থাৎ যে কমিশন বা ডেলিভারি চার্জ মার্কেটপ্লেস পাচ্ছে, সেটির উপর ১৫% হারে ভ্যাট দিতে হবে। কারণ অনলাইন পণ্য বিক্রয় সেবা নিজেই একটি করযোগ্য সেবা।

অনলাইন বিক্রেতাদের কি মূসক-৪.৩ ফর্ম জমা দিতে হবে?

না, অনলাইন খুচরা পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ইনপুট-আউটপুট সহগ ঘোষণা (মূসক-৪.৩) দাখিল বাধ্যতামূলক নয়। কারণ তারা অগণিত পণ্য বিক্রি করেন এবং প্রতিটির জন্য আলাদা ঘোষণা দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।

উপসংহার

ই-কমার্স ও মার্কেটপ্লেসে ভ্যাট ২০২৬-এর নতুন নিয়ম বাংলাদেশের অনলাইন ব্যবসার জন্য একটি বড় পদক্ষেপ। NBR এবার স্পষ্ট করে দিয়েছে, কে কোন ভিত্তিতে ভ্যাট দেবে। অনলাইন খুচরা বিক্রেতারা ৭.৫% হারে ভ্যাট দেবেন এবং মার্কেটপ্লেসগুলো শুধু তাদের কমিশনের উপর ১৫% ভ্যাট দেবে। দ্বৈত কর এড়ানো এবং স্বচ্ছতা বাড়ানো এই আদেশের মূল উদ্দেশ্য। যদি আপনি একজন অনলাইন উদ্যোক্তা হন, তাহলে এখনই নিজের ভ্যাট নিবন্ধন ও পরিশোধ পরিকল্পনা আপডেট করুন এবং প্রয়োজনে একজন ভ্যাট পরামর্শকের সহায়তা নিন।

About The Author

Leave a Reply