বিদেশে অবস্থানরত লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশির জন্য সুখবর নিয়ে এসেছে সরকার। প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা একটিমাত্র ডিজিটাল পরিচয়পত্রের মাধ্যমে প্রবাসীদের সব ধরনের সরকারি ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করবে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রবাসী কার্ড চালু হলে আলাদাভাবে বিএমইটি কার্ড বহনের প্রয়োজন হবে না।
মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, একটি কার্ড দিয়ে সব ধরনের সুবিধা ভোগ করা যাবে। এই কার্ডটি ক্রেডিট কার্ডের মতো কাজ করবে এবং প্রবাসীরা সহজেই এতে আবেদন করতে পারবেন। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীরাই নয়, ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকায় অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও এই কার্ডের জন্য যোগ্য হবেন।
প্রবাসী কার্ড কী এবং কেন চালু হচ্ছে
প্রবাসী কার্ড হলো বাংলাদেশ সরকারের একটি নতুন ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রকল্প। বর্তমানে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সেবার জন্য একাধিক কার্ড ও নথিপত্র বহন করতে হয়। এই জটিলতা দূর করতেই সরকার প্রবাসী কার্ড বাংলাদেশ চালুর পরিকল্পনা করছে। বিশ্বের প্রায় ১৬০টিরও বেশি দেশে কর্মরত এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসী এই সুবিধার আওতায় আসবেন।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কার্ডটির মাধ্যমে ডিজিটাল পরিচয় যাচাই, ব্যাংকিং সেবা, রেমিট্যান্স ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি সেবা একই প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রবাসীরা দেশে থাকাকালীন বা বিদেশে থাকার সময় উভয় ক্ষেত্রেই এই কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন।
প্রবাসী কার্ড চালু হলে বিএমইটি কার্ড থাকবে না
বর্তমানে বিদেশ গমনেচ্ছু কর্মীদের বিএমইটি (জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো) কার্ড সংগ্রহ করতে হয়। প্রবাসী কার্ড চালু হলে এই আলাদা কার্ডের প্রয়োজনীয়তা শেষ হবে। মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, প্রবাসী কার্ড হলে বিএমইটি কার্ড থাকবে না, কারণ এত কার্ড নিয়ে প্রবাসীদের ঝামেলায় পড়তে হয়। একটি কার্ডেই সব সুবিধা নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
এই পরিবর্তনের ফলে প্রবাসীদের জীবন অনেকটা সহজ হবে। বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরে ঘুরে আলাদা কার্ড সংগ্রহের ঝামেলা আর থাকবে না। সব তথ্য একটি কার্ডে সংরক্ষিত থাকবে এবং ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে সরকার প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে পারবে।
প্রবাসী কার্ডের সুবিধা সমূহ যা পাবেন
সরকার এখনো প্রবাসী কার্ডের সব সুবিধা চূড়ান্ত করেনি। তবে মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী নিচের সুবিধাগুলো এই কার্ডে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
- বৈদেশিক মুদ্রা ও রেমিট্যান্স সুবিধা: প্রবাসী কার্ড ব্যবহার করে সহজে এবং দ্রুত দেশে অর্থ পাঠানো যাবে। বিশেষ বেনিফিট প্যাকেজে কম খরচে বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর সুযোগ থাকবে।
- ব্যাংকিং গেটওয়ে সুবিধা: ব্যাংক পেমেন্টের গেটওয়ে সহজ করা হবে। প্রবাসী কার্ডধারীরা দেশের যেকোনো ব্যাংকে সহজে লেনদেন করতে পারবেন।
- ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও ট্র্যাকিং: এই কার্ডটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র হিসেবে কাজ করবে এবং ট্র্যাকিং সিস্টেমের মাধ্যমে প্রবাসীর তথ্য নিরাপদ থাকবে।
- ভূমি সংক্রান্ত অগ্রাধিকার সেবা: প্রবাসী কার্ড দেখালে ভূমি অফিসে অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবা পাওয়া যাবে। এজন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
- হাসপাতালে বিশেষ সুবিধা: প্রবাসীরা দেশে এসে হাসপাতালে গেলে বিশেষ অগ্রাধিকার পাবেন। দীর্ঘ লাইনে না দাঁড়িয়ে দ্রুত চিকিৎসা সেবা নিতে পারবেন।
- অভিযোগ নিষ্পত্তি সেল: সম্প্রতি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘অভিযোগ নিষ্পত্তি ও নিরসন সেল’ চালু করেছে। এই সেলের মাধ্যমে প্রবাসীরা সরাসরি বা হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগ জানাতে পারবেন।
প্রবাসী কার্ড কারা পাবেন এবং কীভাবে আবেদন করবেন
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রবাসী কার্ড আবেদন প্রক্রিয়া বেশ সহজ হবে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীরা নয়, বিশ্বের যেকোনো দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা এই কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন। নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে।
১. মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত সেলে আবেদন করতে হবে।
২. আবেদন যাচাই-বাছাই করা হবে।
৩. যোগ্যতা প্রমাণিত হলে কার্ড ইস্যু করা হবে।
৪. ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও ল্যাটিন আমেরিকাসহ সব দেশের প্রবাসীরা আবেদনের সুযোগ পাবেন।
প্রবাসী কার্ড কবে চালু হবে এবং বর্তমান অবস্থা
২০২৬ সালের জুন মাসে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রবাসী কার্ড কবে চালু হবে তা এখনো নির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি, তবে কার্ডের সুবিধা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। ব্যাংকিং গেটওয়ে, বৈদেশিক মুদ্রা সুবিধা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে। এখন প্রবাসীরা প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান। সেবা সহজলভ্য হলে হুন্ডির পরিবর্তে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রবাসী কার্ড ও বিএমইটি কার্ডের পার্থক্য
অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, প্রবাসী কার্ড ও বিএমইটি কার্ডের পার্থক্য কী। বিএমইটি কার্ড মূলত বিদেশগামী কর্মীদের নিবন্ধন ও পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহৃত হতো। এটি সীমিত সংখ্যক সেবার জন্য প্রযোজ্য ছিল। অন্যদিকে প্রবাসী কার্ড হবে একটি বহুমুখী ডিজিটাল সমাধান। এই কার্ডে ব্যাংকিং সুবিধা, ভূমি সেবা, স্বাস্থ্যসেবা অগ্রাধিকার এবং ডিজিটাল পরিচয় একসঙ্গে থাকবে।
সহজ কথায় বলতে গেলে, বিএমইটি কার্ড ছিল শুধু শ্রমিক নিবন্ধনের একটি পরিচয়পত্র। কিন্তু প্রবাসী কার্ড হবে একটি সম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থাপনার টুল, যা প্রবাসী জীবনের প্রতিটি দিকে সহায়তা করবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রবাসী কার্ড চালু হলে কি বিএমইটি কার্ড লাগবে না?
না, প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন যে প্রবাসী কার্ড চালু হলে আলাদা বিএমইটি কার্ডের প্রয়োজন হবে না। একটিমাত্র প্রবাসী কার্ড দিয়ে সব সুবিধা পাওয়া যাবে। সরকারের লক্ষ্য হলো একাধিক কার্ডের ঝামেলা শেষ করে প্রবাসীদের জীবন সহজ করা।
প্রবাসী কার্ড কে পাবেন এবং কারা আবেদন করতে পারবেন?
বিশ্বের যেকোনো দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকরা প্রবাসী কার্ডের জন্য আবেদন করতে পারবেন। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা নন, ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকায় থাকা প্রবাসীরাও আবেদনের সুযোগ পাবেন। আবেদনের পর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে যোগ্য প্রবাসীকে কার্ড দেওয়া হবে।
প্রবাসী কার্ড দিয়ে কি রেমিট্যান্স পাঠানো সহজ হবে?
হ্যাঁ, সরকারের পরিকল্পনায় রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করার বিষয়টি রয়েছে। প্রবাসী কার্ডের সঙ্গে বিশেষ ব্যাংকিং গেটওয়ে যুক্ত থাকবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। এতে হুন্ডির বিকল্প হিসেবে বৈধ চ্যানেলে অর্থ পাঠানো আরও আকর্ষণীয় হবে।
প্রবাসী কার্ড দিয়ে কি দেশে হাসপাতাল সুবিধা পাওয়া যাবে?
সরকার এই বিষয়ে ইতিবাচক পরিকল্পনা করছে। মন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রবাসীরা দেশে এসে হাসপাতালে গেলে কার্ড দেখিয়ে আলাদা অগ্রাধিকার সেবা পাবেন। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।
প্রবাসী কার্ড কবে থেকে চালু হবে?
২০২৬ সালের জুনে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। তবে সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো জানানো হয়নি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের পর কার্ডের সুবিধা চূড়ান্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবাসী কার্ড চালু করা হবে।
উপসংহার
প্রবাসী কার্ড বাংলাদেশের প্রবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একটি কার্ডেই বিএমইটি নিবন্ধন থেকে শুরু করে রেমিট্যান্স, ব্যাংকিং, ভূমি ও স্বাস্থ্যসেবা সব কিছু পাওয়া যাবে। প্রবাসী কার্ড সুবিধা সম্পূর্ণরূপে চালু হলে বিদেশে অবস্থানরত কোটি কোটি বাংলাদেশির জীবন আরও সহজ ও মর্যাদাপূর্ণ হবে। সরকারের এই উদ্যোগ দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে এবং প্রবাসীদের দেশের উন্নয়নে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সাহায্য করবে। প্রবাসী কার্ড চালু সংক্রান্ত সর্বশেষ আপডেটের জন্য প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অফিশিয়াল চ্যানেল অনুসরণ করুন।
