সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি এই প্রশ্নের সঠিক ও হালনাগাদ উত্তর হলো, বাংলাদেশে বর্তমানে ৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ২টি বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক রয়েছে, অর্থাৎ সর্বমোট ৯টি সরকারি ব্যাংক দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাঁচটি দুর্বল ইসলামি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককেও এখন রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ফলে আগের ৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের সঙ্গে নতুন এই ব্যাংকটি যুক্ত হয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭টিতে।
অনেকেই চাকরি খোঁজা, টাকা জমা রাখা, ঋণ নেওয়া কিংবা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে জানতে চান বাংলাদেশের সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি নাম। এইখানে প্রতিটি ব্যাংকের নাম, প্রতিষ্ঠাকাল, কার্যক্রম এবং গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের পার্থক্য, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রেক্ষাপট এবং প্রায়ই জিজ্ঞাসিত কিছু প্রশ্নের উত্তরও দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক কয়টি ও কি কি
বাংলাদেশে সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি জানতে হলে প্রথমেই রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক বা State-Owned Commercial Bank (SOCB) সম্পর্কে জানা দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী এই ব্যাংকগুলো সরকারের সম্পূর্ণ বা প্রধান মালিকানায় পরিচালিত হয়। বর্তমানে এই ধরনের ব্যাংকের সংখ্যা ৭টি। নিচে প্রতিটি ব্যাংক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হলো।
- সোনালী ব্যাংক পিএলসি: এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সরকারি ব্যাংক। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক জাতীয়করণ আদেশ অনুসারে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অনুমোদিত মূলধন প্রায় ৬০০০ কোটি টাকা এবং সদর দপ্তর ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত।
- জনতা ব্যাংক পিএলসি: দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হিসেবে এটি বড় পরিসরে সরকারি ও বেসরকারি আমানত পরিচালনা করে। ব্যাংকটির সদর দপ্তর মতিঝিলে নিজস্ব ২৪ তলা ভবনে অবস্থিত।
- অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি: শহর ও গ্রামীণ এলাকায় ব্যাপক শাখা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই ব্যাংক সেবা দিয়ে থাকে। শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে অর্থায়নে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
- রুপালী ব্যাংক পিএলসি: ১৯৭২ সালে মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক, অস্ট্রালেশিয়া ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক একীভূত করে এই ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
- বেসিক ব্যাংক পিএলসি: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে অর্থায়নের জন্য মূলত এই ব্যাংক গঠিত হয়েছিল এবং এখনও এই খাতেই এটি বিশেষভাবে কাজ করে।
- বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিএলসি (বিডিবিএল): শিল্পায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে ঋণ সহায়তা দেওয়াই এর মূল কাজ। দুটি প্রতিষ্ঠান একীভূত করে এই ব্যাংকটি গঠন করা হয়েছিল।
- সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি: পাঁচটি দুর্বল শরিয়াভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করে সম্প্রতি এই নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামি ব্যাংকটি গঠিত হয়েছে। এটি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রায়ত্ত শরিয়াহভিত্তিক বাণিজ্যিক ব্যাংক।
এই সাতটি ব্যাংক মিলিয়েই বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের সম্পূর্ণ তালিকা তৈরি হয়। তাই কেউ যদি জিজ্ঞাসা করেন সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি বাণিজ্যিক ক্যাটাগরিতে, তাহলে সরাসরি এই সাতটি নামই বলা যাবে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কেন এখন সরকারি ব্যাংক
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক তারল্য সংকট ও অনিয়মের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এই পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে এই একীভূতকরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল করা। এই একীভূতকরণের ফলেই আগের ৬টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সংখ্যাটি বেড়ে ৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ছাড়াও বাংলাদেশে বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক রয়েছে, যেগুলো নির্দিষ্ট খাতে সেবা দেওয়ার জন্য গঠিত হয়েছে। কৃষি খাতে অর্থায়নের জন্য এই ব্যাংকগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে এদের অবদান উল্লেখযোগ্য।
- বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক: সারাদেশে কৃষকদের স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত প্রধান কৃষি ব্যাংক। ফসল উৎপাদন, সেচ যন্ত্রপাতি ক্রয় ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণে এই ব্যাংক থেকে ঋণ দেওয়া হয়।
- রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক: মূলত রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে কৃষি ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং উত্তরাঞ্চলের কৃষি উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
বাণিজ্যিক ৭টি এবং বিশেষায়িত ২টি মিলিয়ে বাংলাদেশে সর্বমোট সরকারি ব্যাংকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯টিতে।
পূবালী ব্যাংক কি সরকারি ব্যাংক?
অনেকে পূবালী ব্যাংককে সরকারি ব্যাংক মনে করেন, তবে বাস্তবে এটি একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। ১৯৮৩ সালে সরকারি মালিকানা থেকে বেসরকারিকরণ করার পর থেকে পূবালী ব্যাংক বেসরকারি খাতে পরিচালিত হচ্ছে। তাই সরকারি ব্যাংক এর তালিকায় পূবালী ব্যাংকের নাম থাকে না। একই ভাবে উত্তরা ব্যাংক এবং ঢাকা ব্যাংকও একসময় সরকারি মালিকানায় থাকলেও পরবর্তীতে বেসরকারিকরণ হয়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে পার্থক্য
সরকারি ব্যাংক সম্পূর্ণ বা প্রধানত রাষ্ট্রের মালিকানায় থাকে, আর বেসরকারি ব্যাংক ব্যক্তিমালিকানাধীন শেয়ারহোল্ডারদের দ্বারা পরিচালিত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে সরকারি ব্যাংকে সুদের হার সাধারণত তুলনামূলক কম হয় এবং সরকারি প্রকল্পের অর্থায়ন এখান থেকেই বেশি হয়ে থাকে। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংক গ্রাহকসেবা, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং প্রযুক্তিগত সুবিধায় এগিয়ে থাকার চেষ্টা করে। নিচে কয়েকটি মূল পার্থক্য তুলে ধরা হলো।
- মালিকানা কাঠামো ভিন্ন, সরকারি ব্যাংকে রাষ্ট্র প্রধান শেয়ারহোল্ডার।
- ঋণের সুদের হার সরকারি ব্যাংকে সাধারণত কম থাকে।
- নিয়োগ প্রক্রিয়া সরকারি ব্যাংকে সরকারি নিয়ম অনুসরণ করে হয়।
- ডিজিটাল সেবা ও গ্রাহক অভিজ্ঞতায় বেসরকারি ব্যাংক তুলনামূলক দ্রুত উন্নতি করছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
বাংলাদেশে সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি
বাংলাদেশে বর্তমানে ৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ২টি বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক রয়েছে, অর্থাৎ সর্বমোট ৯টি সরকারি ব্যাংক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংখ্যা ৬টি থেকে বেড়ে ৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
পূবালী ব্যাংক কি সরকারি ব্যাংক?
না, পূবালী ব্যাংক একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। ১৯৮৩ সালে এটি বেসরকারিকরণ করা হয়েছিল এবং এখন ব্যক্তিমালিকানাধীন শেয়ারহোল্ডারদের দ্বারা পরিচালিত হয়।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক কেন সরকারি ব্যাংকের তালিকায় যুক্ত হলো?
পাঁচটি দুর্বল শরিয়াভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংক একীভূত করে বাংলাদেশ ব্যাংক এই নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করেছে। মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে চলে যাওয়ায় এটি এখন রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
বিশেষায়িত ব্যাংক কয়টি ও কি কি?
বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক দুটি, যথা বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। এই দুটি ব্যাংক মূলত কৃষি খাতে ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সরকারি ব্যাংক কোনটি?
সোনালী ব্যাংক পিএলসি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সরকারি ব্যাংক। শাখার সংখ্যা এবং সম্পদের পরিমাণের দিক থেকে এটি শীর্ষে রয়েছে।
উপসংহার
সরকারি ব্যাংক কয়টি ও কি কি জানা থাকলে চাকরি খোঁজা, ব্যবসায়িক লেনদেন কিংবা সাধারণ ব্যাংকিং সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়ে যায়। বাংলাদেশের ৭টি রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং ২টি বিশেষায়িত ব্যাংক মিলিয়ে মোট ৯টি সরকারি ব্যাংক এই মুহূর্তে তালিকাভুক্ত রয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অন্তর্ভুক্তি প্রমাণ করে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ক্রমাগত পরিবর্তনশীল, তাই ভবিষ্যতে নতুন তথ্যের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিসিয়াল সূত্র নিয়মিত অনুসরণ করা উচিত।
