প্রবাসে থাকা লাখো বাংলাদেশি এখন চাইলেই নিজের বিদেশি মোবাইল নাম্বার দিয়ে বিকাশ একাউন্ট ব্যবহার করতে পারছেন। আগে দেশের বাইরে থেকে বিকাশ সেবা নেওয়া অনেকটাই কঠিন ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিদেশ থেকে বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম অনেক সহজ হয়ে গেছে। এখন আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বসবাসরত দেশের মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করে একাউন্ট খুলতে পারবেন।
এই সুবিধার ফলে প্রবাসীরা নিজের কষ্টার্জিত টাকা সরাসরি বিকাশ একাউন্টে এনে দেশে থাকা পরিবারের কাছে মুহূর্তেই পাঠাতে পারছেন। আমরা আলোচনা করবো কোন কোন দেশ থেকে বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার করা যায়, কীভাবে একাউন্ট খুলবেন, কীভাবে বিদেশ থেকে টাকা আনবেন এবং কমন সমস্যাগুলোর সমাধান কী। আপনি যদি প্রবাসে থেকে বিকাশ সেবা নিতে চান, তাহলে পুরো লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
বিদেশ থেকে বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম কী
বিদেশ থেকে বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম অনুযায়ী, একজন বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রধারী গ্রাহক তার এনআইডি এবং বসবাসরত দেশের মোবাইল নাম্বার দিয়ে সহজেই একাউন্ট খুলতে পারেন। আগে বিকাশ একাউন্ট শুধু বাংলাদেশি সিম নাম্বার দিয়েই খোলা যেত। এখন এই সীমাবদ্ধতা তুলে দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে প্রবাসীদের আর দেশে থাকা কারো ওপর নির্ভর করতে হয় না। নিজের হাতেই তারা একাউন্ট খুলতে এবং পরিচালনা করতে পারছেন। এই পরিবর্তন প্রবাসী কমিউনিটির জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোন কোন দেশ থেকে বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার করা যায়
বর্তমানে বিশ্বের অনেকগুলো দেশ থেকে বিকাশ অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু দেশ হলো:
- সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র
- সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত
- অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন
- ভারত, চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক
এছাড়া আরও প্রায় ৪৬টি দেশ থেকে গ্রাহকরা নিজ বিকাশ একাউন্টে টাকা এনে ব্যবহার করতে পারেন। তাই আপনি যেই দেশেই থাকুন, একবার তালিকা দেখে নেওয়া ভালো।
বিদেশে বিকাশ একাউন্ট খোলার ধাপসমূহ
বিদেশ থেকে বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম মেনে একাউন্ট খুলতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
ধাপ ১: লগ ইন / রেজিস্ট্রেশন শুরু করুন
বিকাশ অ্যাপ ওপেন করার পর স্ক্রিনে দেখানো হবে “এখন বাংলাদেশি NID দিয়ে বিকাশ একাউন্ট খুলুন যেখানে সেখান থেকেই”। আপনার বাংলাদেশি NID দিয়ে একাউন্ট খুলতে “লগ ইন / রেজিস্ট্রেশন” বাটনে চাপুন।
ধাপ ২: মোবাইল নাম্বার প্রদান করুন
আপনি বর্তমানে যে দেশে অবস্থান করছেন (স্ক্রিনশটে উদাহরণ হিসেবে Canada দেখানো হয়েছে), সেই দেশের কান্ট্রি কোডসহ আপনার মোবাইল নাম্বারটি লিখুন।
ধাপ ৩: ভেরিফিকেশন কোড নিশ্চিত করুন
আপনার দেওয়া নাম্বারে একটি SMS ভেরিফিকেশন কোড পাঠানো হবে। কোডটি বসিয়ে নিশ্চিত করুন। এখানে সতর্কবার্তা দেওয়া থাকে যে বিকাশ পিন ও ভেরিফিকেশন কোড কাউকে দেওয়া যাবে না।
ধাপ ৪: পাসপোর্টের প্রুফ অব ডিপারচার আপলোড করুন
আপনি যে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গিয়েছেন তার প্রমাণ হিসেবে পাসপোর্টের Departure/Arrival সিলের পাতার ছবি তুলে আপলোড করতে হবে।
ধাপ ৫: NID-এর সামনের অংশের ছবি তুলুন
বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রের সামনের অংশ ফ্রেমের মধ্যে রেখে ছবি তুলুন।
ধাপ ৬: NID-এর পেছনের অংশের ছবি তুলুন
জাতীয় পরিচয়পত্রের পেছনের অংশও একইভাবে ফ্রেমের মধ্যে রেখে ছবি তুলুন।
ধাপ ৭: NID তথ্য যাচাই করুন
সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে NID থেকে নাম (বাংলা ও ইংরেজি), পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ, NID নাম্বার, ব্লাড গ্রুপ ও ঠিকানা তুলে আনবে। সব তথ্য সঠিক আছে কিনা যাচাই করে এগিয়ে যান।
ধাপ ৮: অতিরিক্ত তথ্য পূরণ করুন
Gender, Source of Fund (আয়ের উৎস), Estimated Monthly Income এবং Occupation (পেশা) সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে এগিয়ে যান।
ধাপ ৯: ৫ ডিজিটের নতুন পিন সেট করুন
আপনার বিকাশ একাউন্টের জন্য একটি নতুন ৫ ডিজিটের পিন সেট করুন এবং কনফার্ম করুন।
ধাপ ১০: একাউন্টে লগ ইন করুন
আপনার বিকাশ অ্যাকাউন্ট নাম্বার এবং সদ্য সেট করা পিন দিয়ে লগ ইন করুন।
ধাপ ১১: নাম ও প্রোফাইল ছবি সেট করুন
আপনার First Name ও Last Name লিখুন এবং প্রোফাইল ছবি সেট করুন।
ধাপ ১২: বিদেশ থেকে বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার শুরু করুন
এখন আপনার একাউন্ট সম্পূর্ণ প্রস্তুত। “Transact from abroad to Bangladesh” অপশনসহ আপনি বিদেশ থেকেই বিকাশ অ্যাপের সব সুবিধা ব্যবহার করতে পারবেন – টাকা পাঠানো, মোবাইল রিচার্জসহ অন্যান্য সেবা।

বিদেশ থেকে বিকাশ একাউন্ট নাম্বার পরিবর্তনের ধাপসমূহ
আপনি এখন বিদেশে বসেই আপনার পূর্বের বিকাশ একাউন্ট নাম্বার পরিবর্তন করতে পারবেন। তার সম্পূর্ণধাপ এইখানে উল্লেখ করা হলো:
ধাপ ১: “বিকাশ নাম্বার পরিবর্তন” অপশনে যান
বিকাশ অ্যাপ খুলে “বিকাশ নাম্বার পরিবর্তন” বাটনে ট্যাপ করুন (রেজিস্ট্রেশনের পাশাপাশি এই অপশনটিও থাকে)।
ধাপ ২: নোটিফিকেশন চেক করে এগিয়ে যান
“Update bKash Number” শিরোনামে একটি নোটিফিকেশন স্ক্রিন আসবে, যেখানে বলা থাকে আপনি আপনার বিদ্যমান বিকাশ নাম্বারকে নতুন বাংলাদেশি নাম্বারে (বা এক্ষেত্রে বিদেশি নাম্বারে) আপডেট করতে যাচ্ছেন। “Proceed” বাটনে চাপুন।
ধাপ ৩: বর্তমান বাংলাদেশি মোবাইল নাম্বার দিন
Country Code হিসেবে Bangladesh সিলেক্ট করা থাকবে এবং আপনার বর্তমান বিকাশ নাম্বার (যেমন +88 01751019626) লিখে “Next” চাপুন।
ধাপ ৪: আপনার নতুন বিদেশি মোবাইল নাম্বার দিন
এবার Country Code পরিবর্তন করে আপনি যে দেশে অবস্থান করছেন (উদাহরণে Canada) সেই দেশের কোডসহ আপনার নতুন মোবাইল নাম্বার দিন।
ধাপ ৫: ভেরিফিকেশন কোড নিশ্চিত করুন
নতুন নাম্বারে পাঠানো SMS ভেরিফিকেশন কোডটি বসিয়ে নিশ্চিত করুন। এখানেও সতর্কবার্তা থাকে যে বিকাশ পিন ও ভেরিফিকেশন কোড কাউকে দেওয়া যাবে না।
ধাপ ৬: পাসপোর্টের প্রুফ অব ডিপারচার/অ্যারাইভাল আপলোড করুন
আপনি প্রবাসে অবস্থান করছেন তার প্রমাণ হিসেবে পাসপোর্টের Departure/Arrival সিলের পাতার ছবি তুলে আপলোড করুন।
ধাপ ৭: ফেস ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করুন
নির্দেশনা অনুযায়ী স্থির থেকে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে চেহারার ছবি (ফেস স্ক্যান) তুলুন, যা দিয়ে আপনার পরিচয় যাচাই করা হবে।
ধাপ ৮: SMS-এ পাওয়া অস্থায়ী পিন দিন
বিদেশি মোবাইল নাম্বারে একটি SMS-এর মাধ্যমে অস্থায়ী (Temporary) পিন পাঠানো হবে। সেটি বসিয়ে “Confirm” করুন।
ধাপ ৯: ৫ ডিজিটের নতুন পিন সেট করুন
আপনার একাউন্টের জন্য একটি নতুন ৫ ডিজিটের বিকাশ পিন সেট করুন এবং পুনরায় লিখে কনফার্ম করুন।
ধাপ ১০: নতুন নাম্বার ও পিন দিয়ে লগ ইন করুন
আপনার নতুন বিদেশি একাউন্ট নাম্বার এবং সদ্য সেট করা পিন দিয়ে বিকাশ একাউন্টে লগ ইন করুন।
ধাপ ১১: নাম ও প্রোফাইল ছবি সেট করুন
প্রয়োজন অনুযায়ী আপনার First Name, Last Name নিশ্চিত করুন এবং প্রোফাইল ছবি সেট করুন।
ধাপ ১২: বিদেশ থেকে বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার শুরু করুন
নাম্বার পরিবর্তন সম্পন্ন হওয়ার পর “Transact from abroad to Bangladesh” সুবিধাসহ আপনি এখন বিদেশ থেকেই আপনার বিকাশ একাউন্ট পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারবেন।

বিদেশ থেকে বিকাশ একাউন্টে টাকা আনার উপায়
প্রবাসী বিকাশ একাউন্ট ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সহজে টাকা পাঠানোর সুযোগ। এজন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হয়:
- নির্দিষ্ট মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানের দোকান বা অ্যাপে যান
- প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করুন
- আপনার বিকাশ একাউন্ট নাম্বার উল্লেখ করুন
- যে পরিমাণ টাকা পাঠাতে চান তা লিখুন
এভাবে পাঠানো রেমিটেন্স সরকারি বোনাসসহ (হাজারে ২৫ টাকা) সরাসরি আপনার একাউন্টে জমা হয়ে যায়। এরপর আপনি চাইলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই দেশে টাকা পাঠাতে পারবেন বা মোবাইল রিচার্জ করতে পারবেন।
বিদেশে বিকাশ একাউন্ট ব্যবহারে সাধারণ সমস্যা ও সমাধান
অনেক সময় বাংলাদেশে অবস্থান করেও ফোনে “সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যবহারের নাম্বার” সংক্রান্ত নোটিফিকেশন আসতে পারে। এমন হলে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
- ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনো ভিপিএন চালু আছে কিনা নিশ্চিত করুন এবং থাকলে বন্ধ করুন
- মোবাইল ডাটা ব্যবহার করে লগইন করার চেষ্টা করুন
- ফোনে বাংলাদেশি সিম সক্রিয় আছে কিনা যাচাই করুন
- অ্যাপ বন্ধ করে ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে মুছে আবার চালু করুন
- সমস্যা থেকে গেলে আইপি ঠিকানা ও আইএসপির নাম বিকাশ গ্রাহক সেবায় শেয়ার করুন
এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।
প্রবাসীদের জন্য বিকাশ ব্যবহারের সুবিধা
বিদেশ থেকে নিজের একাউন্ট সরাসরি পরিচালনা করতে পারার ফলে প্রবাসীরা এখন অনেক বেশি স্বাধীনভাবে আর্থিক লেনদেন করতে পারছেন। এতে সময় বাঁচে এবং মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতাও কমে।
এছাড়া, সরকারি প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ থাকায় প্রবাসী আয় বৈধ চ্যানেলে দেশে আসার হারও বাড়ছে। ফলে প্রবাসী বিকাশ একাউন্ট এখন শুধু সুবিধাই নয়, বরং একটি নিরাপদ ও লাভজনক মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বসবাসরত দেশের মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করে বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি একাউন্ট খোলা যায়।
সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্যসহ প্রায় ৪৬টি দেশ থেকে বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার করা যায়।
হ্যাঁ, চাইলে পুরনো একাউন্টে নিজের বিদেশি নাম্বার আপডেট করে ব্যবহার করা যায়।
হ্যাঁ, রেমিটেন্সের সঙ্গে সরকারি বোনাস হিসেবে প্রতি হাজারে ২৫ টাকা যোগ হয়।
ভিপিএন বন্ধ করে মোবাইল ডাটা দিয়ে লগইন চেষ্টা করুন, তাতেও সমাধান না হলে বিকাশ গ্রাহক সেবায় যোগাযোগ করুন।
শেষকথা
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিদেশ থেকে বিকাশ একাউন্ট খোলার নিয়ম এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ ও প্রবাসীবান্ধব হয়ে উঠেছে। জাতীয় পরিচয়পত্র এবং বসবাসরত দেশের নাম্বার থাকলেই যে কেউ নিজের একাউন্ট খুলে ফেলতে পারেন। এতে করে দেশে থাকা প্রিয়জনের কাছে টাকা পাঠানো হয়ে উঠেছে দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত।
আপনি যদি প্রবাসে থাকেন এবং এখনো বিকাশ একাউন্ট ব্যবহার শুরু না করে থাকেন, তাহলে আজই অ্যাপটি ডাউনলোড করে ট্রাই করে দেখতে পারেন। এই লেখাটি সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন থাকলে কমেন্টে জানাতে পারেন।
