Site icon Chartered Journal

ট্রেড লাইসেন্স করার নিয়ম ও খরচ ২০২৬

Trade License BD

আপনি কি জানেন, ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা পরিচালনা করা বাংলাদেশে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ?

অনেকেই আবেগের বশে নতুন ব্যবসা শুরু করে দেন, ডেকোরেশন করেন, পণ্য তোলেন-কিন্তু আইনি কাগজপত্রের কথা বেমালুম ভুলে যান। ফলাফল? হঠাৎ একদিন মোবাইল কোর্টের অভিযান, মোটা অংকের জরিমানা অথবা ব্যবসা বন্ধের নোটিশ। আপনার স্বপ্নের উদ্যোগ যাতে শুরুতেই হোঁচট না খায়, তার জন্য প্রয়োজন একটি বৈধ ‘ট্রেড লাইসেন্স’।

আজকের এই গাইডে আমরা খুব সহজ ভাষায় জানবো-কীভাবে ট্রেড লাইসেন্স করবেন, কী কী কাগজ লাগবে এবং আসলে খরচ কত হবে।

ট্রেড লাইসেন্স কী এবং কেন প্রয়োজন?

Trade মানে হচ্ছে ব্যবসা আর License মানে হচ্ছে অনুমতি অর্থাৎ ট্রেড লাইসেন্স মানে হচ্ছে ব্যবসার অনুমতিপত্র । বাংলাদেশে যেকোনো ধরণের ব্যবসা বা বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ) থেকে যে অনুমতিপত্র নিতে হয়, তাকেই ট্রেড লাইসেন্স বলে। এটি আপনার ব্যবসার বৈধতার প্রথম প্রমাণপত্র। ব্যাংক লোন পাওয়া থেকে শুরু করে ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন-সব খানেই এটি লাগবে।

কোন জায়গা থেকে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহ করতে হয়?

ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করে স্থানীয় সরকার, যথা: সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ। তাই ট্রেড লাইসেন্স এর জন্য আপনার নিকটস্থ সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদ এ আবেদন করতে হবে।

ট্রেড লাইসেন্স এর প্রকারভেদ

উদ্যোক্তাদের জন্য দুই ধরনের ট্রেড লাইসেন্স প্রদান করা হয়।

১. সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স

২. ফ্যাক্টরী বা শিল্প প্রতিষ্ঠান ট্রেড লাইসেন্স

ট্রেড লাইসেন্স এর জন্য যেসকল কাগজপত্রাদি জমা দিতে হয়

সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স করতে যেসকল কাগজপত্র প্রয়োজন হবে:

শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য ট্রেড লাইসেন্স করতে উপরোক্ত কাগজপত্রসহ আরও যেসকল কাগজপত্র জমা দিতে হবে:

এছাড়াও শিল্প প্রতিষ্ঠানের ধরণ অনুসারে যেসকল কাগজপত্র জমা দিতে হবে

বি:দ্র: সংযুক্ত সকল কাগজপত্র সত্যায়িত হতে হবে। (প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা/ওয়ার্ড কাউন্সিলর কর্তৃক)

ট্রেড লাইসেন্স করার নিয়ম (ধাপে ধাপে)

বর্তমানে আপনি দুইভাবে ট্রেড লাইসেন্স করতে পারেন-সরাসরি অফিসে গিয়ে অথবা অনলাইনে।

ধাপ ১: ফরম সংগ্রহ

আপনার ব্যবসার অবস্থান যেই জোন বা এলাকার অধীনে (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ), সেই অফিসে গিয়ে ‘কে’ ফরম (K-Form) সংগ্রহ করুন। ঢাকা উত্তর বা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের জন্য অনলাইনেও আবেদন করা যায়।

ধাপ ২: ফরম পূরণ ও জমা

ফরমটি সঠিক তথ্য দিয়ে পূরণ করুন। স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার বা মেম্বারের সুপারিশ স্বাক্ষর নিন। এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ফরমটি লাইসেন্স সুপারভাইজারের কাছে জমা দিন।

ধাপ ৩: পরিদর্শন ও ফি নির্ধারণ

দায়িত্বপ্রাপ্ত লাইসেন্স সুপারভাইজার আপনার দোকান বা অফিস পরিদর্শন করতে পারেন। ব্যবসার ধরণ অনুযায়ী তিনি লাইসেন্স ফি নির্ধারণ করে দেবেন।

ধাপ ৪: ফি জমা ও লাইসেন্স প্রাপ্তি

নির্ধারিত ব্যাংকে ফি জমা দিয়ে রসিদ নিয়ে আসুন। রসিদ জমা দিলেই আপনাকে ট্রেড লাইসেন্স বই বা সনদ বুঝিয়ে দেওয়া হবে।

ট্রেড লাইসেন্স করতে কত টাকা খরচ হয়? (খরচের ধারণা)

ট্রেড লাইসেন্সের খরচ মূলত নির্ভর করে আপনার ব্যবসার ধরণ এবং এলাকার ওপর। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এর স্থানীয় সরকার বিভাগ (সিটি কর্পোরেশন শাখা-২) এর জারিকৃত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশন আদর্শ কর তফসিল ২০১৬ এ উল্লেখিত ট্রেড লাইসেন্স ফি অনুযায়ী ট্রেড লাইসেন্স ফি নির্ধারিত হয়। নিচে একটি সাধারণ ধারণা দেওয়া হলো (২০২৬ সালের সম্ভাব্য রেট অনুযায়ী):

অতিরিক্ত খরচ: মূল ফি-এর সাথে ১৫% ভ্যাট এবং সাইনবোর্ড ট্যাক্স (ব্যবসার প্রচারের জন্য) যুক্ত হবে। সব মিলিয়ে একটি ছোট ব্যবসার জন্য প্রাথমিক খরচ ৫০০০-৭০০০ টাকার মধ্যে হয়ে যায়।

(নোট: ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় খরচ সিটি কর্পোরেশনের তুলনায় অনেক কম হয়।)

ট্রেড লাইসেন্স রিনিউ বা নবায়ন করার নিয়ম

ট্রেড লাইসেন্সের মেয়াদ থাকে এক অর্থবছর (জুলাই থেকে জুন) পর্যন্ত। প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাংকে নবায়ন ফি জমা দিয়ে এটি রিনিউ করতে হয়। সময়মতো রিনিউ না করলে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট হারে জরিমানা বা সারচার্জ দিতে হতে পারে।

সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)

১. ই-কমার্স বা ফেসবুক পেজের জন্য কি ট্রেড লাইসেন্স লাগে?

হ্যাঁ, বর্তমানে অনলাইন ব্যবসার জন্যও ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। একে বলা হয় ‘আইটি বা ই-কমার্স ক্যাটাগরি’ লাইসেন্স।

২. ভাড়া বাসা বা নিজের বাসা থেকে ব্যবসা করলে কি লাইসেন্স পাওয়া যাবে?

অবশ্যই। সেক্ষেত্রে ভাড়ার চুক্তিনামা বা নিজের বাড়ির ইউটিলিটি বিলের কপি জমা দিলেই হবে। ঠিকানাটি বাণিজ্যিক বা আবাসিক কি না, তা অনেক সময় যাচাই করা হয়।

৩. ট্রেড লাইসেন্স পেতে কত দিন সময় লাগে?

সব কাগজপত্র ঠিক থাকলে সাধারণত ৩ থেকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে লাইসেন্স পাওয়া যায়। তবে জরুরিভিত্তিতে বা তদবিরের মাধ্যমে আরও দ্রুত পাওয়া সম্ভব।

শেষ কথা

একটি ট্রেড লাইসেন্স শুধু একটি কাগজ নয়, এটি আপনার ব্যবসার রক্ষকবচ। অহেতুক আইনি ঝামেলা এড়িয়ে নিশ্চিন্তে ব্যবসা বড় করতে চাইলে আজই লাইসেন্স করে ফেলুন। নিজে সময় না পেলে কোনো বিশ্বস্ত কনসালটেন্সি ফার্ম বা আইনজীবীর সহায়তা নিতে পারেন।

আপনার ব্যবসার জন্য কোন ধরণের ট্রেড লাইসেন্স প্রয়োজন তা বুঝতে পারছেন না? অথবা ট্যাক্স ও ভ্যাট নিয়ে কোনো প্রশ্ন আছে? নিচে কমেন্ট করুন, আমরা আপনাকে সাহায্য করতে প্রস্তুত!

Exit mobile version