Site icon Chartered Journal

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক কী এবং কেন বিনিয়োগ করবেন?

bangladesh sukuk

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক হলো একটি শরিয়াহভিত্তিক সরকারি সিকিউরিটিজ, যেখানে বিনিয়োগকারীরা সুদের পরিবর্তে সম্পদ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা পান। ইসলামী অর্থব্যবস্থার মূল নীতি অনুযায়ী রিবা বা সুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তাই প্রচলিত বন্ডের বিকল্প হিসেবে সুকুক তৈরি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো সার্বভৌম বিনিয়োগ সুকুক চালু করে। এরপর থেকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ মে ২০২৬ তারিখে ডিএমডি সার্কুলার নং ০৪/২০২৬ জারি করে সুকুক বিনিয়োগ প্রক্রিয়া আরও সহজ করেছে এবং Sukuk Investor (SI) ID খোলার নির্দেশনা প্রদান করেছে। এই আর্টিকেলে সুকুক কী, কীভাবে কাজ করে, কীভাবে বিনিয়োগ করবেন এবং নতুন সার্কুলারের মূল বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক কী?

সুকুক (Sukuk) আরবি শব্দ “সাক্ক” (Sakk) এর বহুবচন, যার অর্থ “আইনি দলিল”, “দলিলনামা” বা “চেক”। ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সুকুক হলো শরিয়াহসম্মত অর্থায়ন সনদ, যা প্রচলিত বন্ড থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (BGIS) হলো এমন একটি সরকারি সিকিউরিটিজ, যেখানে বিনিয়োগকারী একটি নির্দিষ্ট সম্পদের আংশিক মালিকানা পান এবং সেই সম্পদ থেকে প্রাপ্ত ভাড়া বা মুনাফা আয় করেন।

প্রচলিত বন্ডে বিনিয়োগকারী মূলত ঋণদাতা হিসেবে থাকেন এবং নির্দিষ্ট সুদ পান। কিন্তু সুকুকে বিনিয়োগকারী সম্পদের আংশিক মালিক হন এবং সেই সম্পদ পরিচালনা থেকে আসা মুনাফায় অংশীদার হন। ইসলামী আইন অনুযায়ী সুদ গ্রহণ নিষিদ্ধ হওয়ায় সুকুক মুসলিম বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি আদর্শ বিনিয়োগ মাধ্যম।

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকের ইতিহাস ও অগ্রগতি

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০ সালের অক্টোবরে “বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইনভেস্টমেন্ট সুকুক গাইডলাইনস, ২০২০” প্রণয়ন করে। এরপর থেকে একে একে বেশ কয়েকটি সুকুক ইস্যু হয়েছে:

২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সরকার চারটি পৃথক সার্বভৌম সুকুক ইস্যুর মাধ্যমে মোট ১৯,০০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে এবং ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত মোট সংগৃহীত অর্থ ২২,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন সার্কুলার: সুকুক বিনিয়োগে কী পরিবর্তন এলো

বাংলাদেশ ব্যাংক ৪ মে ২০২৬ তারিখে ডিএমডি সার্কুলার নং ০৪/২০২৬ জারি করে। পরিচালক ইস্তেকমাল হোসেন স্বাক্ষরিত এই সার্কুলারে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মূল বিষয়গুলো হলো:

সুকুক বিনিয়োগ সেবার ফি ও চার্জ কাঠামো

নতুন সার্কুলারে বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকে বিনিয়োগ সংক্রান্ত সেবার ফি ও চার্জ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে (ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত)। নিচে সেবাভিত্তিক চার্জের তালিকা দেওয়া হলো:

উল্লেখ্য, মুনাফা, ভাড়া, আসল পরিশোধ, allotment/holding রিপোর্ট এবং SIID বন্ধকরণের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ফি আরোপ করা যাবে না।

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকে কীভাবে বিনিয়োগ করবেন

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকে বিনিয়োগ করতে হলে প্রথমে Sukuk Investor (SI) ID বা SIID খুলতে হবে। এই প্রক্রিয়াটি এখন ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়। ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় ধাপগুলো হলো:

  1. নিকটস্থ তফসিলি ব্যাংক বা ইসলামিক ব্যাংক শাখায় যোগাযোগ করুন।
  2. SI (SUKUK INVESTOR) ID OPENING FORM (INDIVIDUAL INVESTOR) পূরণ করুন।
  3. প্রয়োজনীয় দলিলাদি জমা দিন: আবেদন ফর্ম, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বিবরণ, NID/পাসপোর্ট, ছবি, e-TIN (প্রযোজ্য হলে), যোগাযোগের তথ্য, মনোনীত ব্যক্তির তথ্য ও ছবি, এবং মনোনীত ব্যক্তির NID/পাসপোর্ট/জন্ম সনদ।
  4. ব্যাংক SIID খোলার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পন্ন করবে।
  5. SIID প্রাপ্তির পর প্রাইমারি নিলামে বা সেকেন্ডারি মার্কেটে বিনিয়োগ করুন।

সর্বনিম্ন বিনিয়োগের পরিমাণ ১০,০০০ টাকা এবং এর গুণিতকে যেকোনো পরিমাণে বিনিয়োগ করা যায়। সর্বোচ্চ কোনো সীমা নেই।

প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য SIID খোলার প্রক্রিয়া

প্রাতিষ্ঠানিক বা অব্যক্তিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আলাদা আবেদন ফর্ম এবং দলিল প্রয়োজন। ব্যাংক/এফসি/লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে আবেদন ফর্ম, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বিবরণ, নিবন্ধন সনদ, পরিচালনা পর্ষদের রেজুলেশন, e-TIN, এবং অনুমোদিত স্বাক্ষরকারীর ছবি ও NID প্রয়োজন। পেনশন, প্রভিডেন্ট, গ্র্যাচুইটি ও মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে নিবন্ধন সনদ, ট্রাস্ট ডিড, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের রেজুলেশন এবং NBR সনদ (প্রযোজ্য হলে) জমা দিতে হবে। বিদেশি বা অনাবাসিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর NFCA/NITA অ্যাকাউন্টের তথ্য, নিগমীকরণ সনদ এবং কাস্টোডিয়ান ব্যাংকের কর্মকর্তার NID ও ছবি প্রয়োজন।

সুকুক ও প্রচলিত বন্ডের মধ্যে পার্থক্য

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক ও প্রচলিত বন্ডের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সুকুকে বিনিয়োগকারী সম্পদের আংশিক মালিক হন, কিন্তু বন্ডে বিনিয়োগকারী শুধুমাত্র ঋণদাতা হিসেবে থাকেন। বন্ডে নির্দিষ্ট সুদ দেওয়া হয়, যা ইসলামী আইনে নিষিদ্ধ। সুকুকে সম্পদ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা বা ভাড়া দেওয়া হয়, যা শরিয়াহসম্মত। বন্ড যেকোনো খাতে বিনিয়োগ করতে পারে, কিন্তু সুকুকের অর্থ শুধুমাত্র শরিয়াহ-অনুমোদিত প্রকল্পে ব্যবহার করা যায়। এছাড়া সুকুক পরিবেশগত ও নৈতিক বিনিয়োগে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের (ESG বিনিয়োগকারী) কাছেও জনপ্রিয় হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকের সুবিধা

সুকুকে বিনিয়োগের বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে।

প্রথমত, এটি সরকারি বিনিয়োগ মাধ্যম হওয়ায় মূলধনের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে।

দ্বিতীয়ত, বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ১০.৪০% হারে মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে, যা ব্যাংক আমানতের চেয়ে অনেক বেশি।

তৃতীয়ত, মুনাফা প্রতি ছয় মাস পরপর পরিশোধ করা হয়।

চতুর্থত, সেকেন্ডারি মার্কেটে সুকুক বেচাকেনা করা যায়।

পঞ্চমত, এটি সম্পূর্ণ শরিয়াহসম্মত হওয়ায় ইসলামী ব্যাংক ও ইসলামী বিনিয়োগকারীদের জন্য আদর্শ।

ষষ্ঠত, দেশীয় ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগকারীই এতে অংশ নিতে পারেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকে সর্বনিম্ন কত টাকা বিনিয়োগ করা যায়?

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকে সর্বনিম্ন ১০,০০০ টাকা বিনিয়োগ করা যায়। এই পরিমাণের গুণিতকে যেকোনো অঙ্কে বিনিয়োগ করা সম্ভব। সর্বোচ্চ বিনিয়োগের কোনো সীমা নেই, ফলে ব্যক্তি থেকে শুরু করে বড় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাই নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এতে অংশ নিতে পারেন।

সুকুক বিনিয়োগে মুনাফা কীভাবে পাওয়া যায়?

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকে মুনাফা প্রতি ছয় মাস পর পর বিনিয়োগকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি জমা হয়। সর্বশেষ সুকুকে বার্ষিক ১০.৪০% হারে ভাড়া/মুনাফা দেওয়া হচ্ছে। মেয়াদ শেষে মূল বিনিয়োগ ফেরত দেওয়া হয়। মুনাফার হার সুকুকের ধরন ও মেয়াদ অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

সুকুক ইনভেস্টর আইডি (SIID) খুলতে কী কী দলিল লাগে?

ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর জন্য আবেদন ফর্ম, ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট, ছবি, যোগাযোগের তথ্য এবং মনোনীত ব্যক্তির তথ্য ও দলিল প্রয়োজন। প্রযোজ্য হলে e-TIN সংযুক্ত করতে হবে। এই দলিলগুলো নিকটস্থ তফসিলি ব্যাংক বা ইসলামিক ব্যাংকের শাখায় জমা দিয়ে SIID খোলা যাবে।

বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা কি সুকুকে বিনিয়োগ করতে পারবেন?

হ্যাঁ, বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ যেকোনো অনাবাসিক বিনিয়োগকারী বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুকে বিনিয়োগ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীর NFCA (Non-Resident Foreign Currency Account) বা NITA (Non-Resident Investors Taka Account) অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হবে। মুনাফা ও মূল অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করা যাবে।

সুকুক কি শেয়ার বাজারে লেনদেন করা যায়?

হ্যাঁ, বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক সেকেন্ডারি মার্কেটে লেনদেন করা যায়। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেকেন্ডারি বাজারে সুকুক ক্রয়-বিক্রয় সম্ভব। প্রতিটি সেকেন্ডারি লেনদেনে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় বিনিয়োগকারীর জন্য ১০০ টাকা চার্জ প্রযোজ্য।

উপসংহার

বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি একদিকে যেমন সরকারকে শরিয়াহসম্মত উপায়ে অবকাঠামো উন্নয়নের অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করছে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীদের নিরাপদ ও মুনাফাজনক বিনিয়োগের সুযোগ দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সার্কুলারে SIID খোলার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট ফি কাঠামো নির্ধারণ করায় সুকুক বিনিয়োগ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ ও সহজলভ্য। যারা হালাল বিনিয়োগে আগ্রহী এবং ঝুঁকিমুক্ত স্থিতিশীল আয় চান, তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক একটি উৎকৃষ্ট বিকল্প।

Exit mobile version