আপনি কি জানেন? আমাদের দেশে অনেক সরকারি সেবা ও ব্যাংকিং কার্যক্রম উপভোগ করতে গেলে এখন আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ (Proof of submission of return) জমা দিতে হবে । আয়কর আইনের ধারা ২৬৪ এ এই বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এই লেখায় রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র কী, কোন কোন সেবা নিতে গেলে এই প্রমাণপত্র দিতে হবে, রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র না করলে কী হবে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ বলতে কি বোঝায়?
“রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ” বলতে বোঝায় আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন এমন একটি ব্যক্তির কাছে থাকা এমন একটি দলিল, যা তার আয়কর রিটার্ন সঠিকভাবে দাখিল করেছেন এমন তথ্য নিশ্চিত করে। এই দলিলটি নির্দিষ্ট কিছু সেবা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় একটি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এই প্রমাণের জন্য নিম্নলিখিত তিনটি দলিলের মধ্যে যেকোন একটি গ্রহণযোগ্য:
- রিটার্ন দাখিলের প্রত্যয়ন বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র: আয়কর রিটার্ন দাখিল করার পর যে রশিদ বা স্বীকারপত্র (Acknowledgement Slip) দেওয়া হয়, তা হলো এই প্রমাণ।
- সিস্টেম জেনেরেটেড সার্টিফিকেট: আয়কর কর্তৃপক্ষের সিস্টেম থেকে জেনারেট করা একটি সার্টিফিকেট, যাতে করদাতার নাম, টিআইএন এবং কর বছর উল্লেখ থাকে।
- উপকর কমিশনারের সার্টিফিকেট: উপকর কমিশনার কর্তৃক ইস্যুকৃত একটি প্রত্যয়ন (Income Tax Certificate), যাতে করদাতার নাম, টিআইএন এবং কর বছর উল্লেখ থাকে।
কোন কোন ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ (Proof of submission of return) দাখিল করতে হয়?
অর্থ আইন ২০২৫ এ রিটার্ন দাখিল প্রমাণের বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রসমূহের তালিকা পূর্বের তালিকা থেকে কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। এর আগে ৪৫টি ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ জমা দিতে হতো, বর্তমানে ৩৯টি ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ জমা দিতে হবে। উক্ত ক্ষেত্রসমূহের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
আর্থিক লেনদেন ও বিনিয়োগ:
- কররোপযোগ্য আয় না থাকলে ২০ লক্ষাধিক টাকার ঋণ গ্রহণ।
- আমদানির জন্য ঋণপত্র খোলা।
- দশ লক্ষাধিক টাকার মেয়াদী আমানত খোলায় ও বহাল রাখিতে।
- দশ লক্ষাধিক টাকার সঞ্চয়পত্র ক্রয়।
ব্যবসায়িক কার্যক্রম:
- কোনো কোম্পানির পরিচালক বা স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার হওয়া।
- কোম্পানির এজেন্সি বা ডিস্ট্রিবিউটরশিপ প্রাপ্তি ও বহাল রাখা।
- ট্রেড বা পেশাজীবী সংস্থার সদস্যপদ প্রাপ্তি অথবা নবায়ন।
- ড্রাগ লাইসেন্স, ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র, বিএসটিআই লাইসেন্স ও ছাড়পত্র প্রাপ্তি ও নবায়ন।
গ্যাসের বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগ প্রাপ্তি ও বহাল রাখা এবং সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আবাসিক গ্যাস সংযোগ প্রাপ্তি এবং বহাল রাখতে।যেকোন এলাকায় গ্যাসের বাণিজ্যিক ও শিল্প সংযোগ প্রাপ্তি ও বহাল রাখিতে।- সিটি কর্পোরেশন এলাকায় আবাসিক গ্যাস সংযোগ প্রাপ্তি।
- লঞ্চ, স্টিমার ইত্যাদি নৌযানের সার্ভে সার্টিফিকেট প্রান্তি ও বহাল রাখা।
- পরিবেশ অধিদপ্তর বা জেলা প্রশাসকের কার্ধালয় হতে ইট উৎপাদনের অনুমতি প্রাপ্তি ও নবায়নে।
- আগ্নেয়ান্ত্রের লাইসেন্স প্রাপ্তি ও বহাল রাখতে।
- আমদানি ও রপ্তানি নিবন্ধন সনদ প্রাপ্তি ও বহাল রাখা।
- সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা এলাকায় ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন।
- বিমার কোম্পানির এজেন্সি সার্টিফিকেট গ্রহণ ও নবায়ন।
- স্ট্যাম্প, কোর্ট ফি ও কার্টিজ পেপারের ভেন্ডর বা দলিল লেখক হিসাবে নিবন্ধন।
হোটেল, রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল ইত্যাদির লাইসেন্স প্রাপ্তি ও নবায়ন।হোটেল, রেস্টুরেন্ট, মোটেল, কমিউনিটি সেন্টার, কনভেনশন হল, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারসমূহের লাইসেন্স গ্রহণ ও নবায়নে।- পণ্য সরবরাহ, চুক্তি সম্পাদন বা সেবা সরবরাহের জন্য টেন্ডার দাখিল।
কোনো কোম্পানী বা ফার্ম কর্তৃক পণ্য বা সেবা সরবরাহ গ্রহণ।এই আইনের ধারা ১৪০ এ সংজ্ঞায়িত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নিকট পণ্য বা সেবা সরবরাহকালে- পণ্য আমদানি বা রপ্তানির জন্য বিল অব এন্ট্রি দাখিল।
বাংলাদেশে অবস্থিত ভোক্তাদের নিকট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পণ্য বা সেবা বিক্রয়।ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করিয়া ই-কমার্স ব্যবসার ক্ষেত্রে লাইসেন্সিং অথরিটির কাছ থেকে লাইসেন্স নবায়নে।
সম্পত্তি ও পরিবহন:
- সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায়
১০ লক্ষাধিক টাকারজমি, বিল্ডিং বা এপার্টমেন্ট বিক্রয় বা লিজ বা হস্তান্তর বা বায়নামা বা আমমোক্তারনামা নিবন্ধন করতে। সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বাড়ি ভাড়া বা লিজ গ্রহণ।এই আইনের ধারা ১৪০ এ সংজ্ঞায়িত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নিকট সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বাড়ি ভাড়া বা লিজ প্রদানকালে।- দ্বি-চক্র ৰা ত্রি-চক্র মোটরযান ব্যতীত অন্যান্য মোটরযানের নিবন্ধন, মালিকানা পরিবর্তন বা ফিটনেস নবায়ন।
পেশা ও শিক্ষা:
- চিকিৎসক, দন্ত চিকিৎসক, আইনজীবী, চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, কস্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট একাউন্টেন্ট, প্রকৌশলী, স্থপতি অথবা সার্ভেয়ার হিসেবে বা সমজাতীয় পেশাজীবী হিসেবে বা কোন স্বীকৃত পেশাজীবী সংস্থার সদস্যপদ নবায়ন করতে।
- সাধারণ বীমার তালিকাভূক্ত সার্ভেয়র লাইসেন্স নবায়ন।
- নিকাহ্ রেজিস্ট্রার হিসেবে লাইসেন্স প্রাপ্তি অথবা নবায়ন।
- ব্যবস্থাপনা বা প্রশাসনিক বা উৎপাদন কার্যক্রমের তত্ত্বাবধানকারী পদমর্যাদায় কর্মরত ব্যক্তির বেতন-ভাতাদি প্রাপ্তি।
- দশম গ্রেড বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার গণকর্মচারীর বেতন ভাতাদি প্রাপ্তি।
- সিটি কর্পোরেশন, জেলা সদর বা পৌরসভায় অবস্থিত ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিশু ভর্তি।
সরকারি সেবা ও অন্যান্য:
- সিটি কর্পোরেশন বা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ প্রাপ্তিতে
বা বহাল। - পৌরসভা, উপজেলা, সিটি কর্পোরেশন বা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ।
মোবাইল ব্যাংকিং বা ইলেক্ট্রনিক্স উপায়ে টাকা স্থানান্তরের মাধ্যমে কমিশন প্রাপ্তি।স্বাভাবিক ব্যক্তি ব্যতীত অন্যান্য করদাতাদের ক্ষেত্রে মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস বা মোবাইল ব্যাংকিং বা ইলেক্ট্রনিক উপায়ে টাকা স্থানান্তরের মাধ্যমে এবং মোবাইল ফোনের হিসাব রিচার্জের মাধ্যমে কমিশন, ফি বা অন্য কোনো অর্থ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে।অ্যাডভাইজারি বা কনসালটেন্সি সার্ভিস ইত্যাদি বাবদ কোন কোম্পানি হতে অর্থ প্রাপ্তি।কোনো নিবাসী করদাতা কর্তৃক অ্যাডভাইজরি বা কনসালটেন্সি সার্ভিস, ক্যাটারিং সার্ভিস, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস, জনবল সরবরাহ, নিরাপত্তা সেবা সরবরাহ বাবদ কোনো কোম্পানি হইতে অর্থ প্রাপ্তিতে।- কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ এবং Societies Registration Act, 1860 এর অধীন নিবন্ধিত কোন ক্লাবের সদস্যপদ লাভের আবেদন।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চিটাগাং উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আরডিএ) অথবা সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট অনুমোদনের নিমিত্ত ভবন নির্মাণের নকশা দাখিল।রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ), গাজীপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা, সময় সময়, সরকার কর্তৃক গঠিত অনুরূপ কর্তৃপক্ষ অথবা সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভার অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট অনুমোদনের নিমিত্ত ভবন নির্মাণের নকশা দাখিলকালে।- এনজিও বিষয়ক ব্যুরোতে নিবন্ধিত এনজিওতে বিদেশি অনুদান ছাড় করতে।
- সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অবস্থিত কমিউনিটি সেন্টার, কনভেনশন হল বা সমজাতীয় কোন সেবা গ্রহণ।
বোর্ড, সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দ্বারা, কোনো ব্যক্তিকে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দাখিল করা হইতে অব্যাহতি দিতে পারিবে।
রিটার্ন দাখিলে প্রমাণ দাখিল না করলে কি হবে?
আপনি যদি কোনো সেবা গ্রহণ করতে যান এবং সেখানে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দাখিল করতে বলা হয়, কিন্তু আপনি যদি তা দিতে না পারেন, তাহলে আপনি সেই সেবাটি পাবেন না।
রিটার্ন দাখিলে প্রমাণ দাখিল না করলে কি হতে পারে?
- সেবা বঞ্চিত হওয়া: আপনি যে সেবাটি নিতে চাচ্ছেন, সেটি আপনাকে দেওয়া হবে না।
- আবেদন বাতিল: আপনার আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে।
- অনুমোদন না পাওয়া: আপনার কোনো লাইসেন্স বা অনুমোদন নাও দেওয়া হতে পারে।
উদাহরণ:
- যদি আপনি সিটি কর্পোরেশন এলাকায় একটি নতুন গ্যাস সংযোগ চান, তাহলে আপনাকে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দেখাতে হবে। না হলে আপনাকে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না।
- আপনি যদি ১০ লক্ষ টাকার অধিক মূল্যের সঞ্চয়পত্র কিনতে চান, তাহলে আপনাকে অবশ্যই আয়কর রিটার্ন দাখিলে প্রমাণ জমা দিতে হবে।
- আপনার যদি সিটি কর্পোরেশ বা পৌরসভায় একটি ব্যবসা থাকে উক্ত ব্যবসায় পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে রিটার্ন প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে।
কোন বৎসরের রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দাখিল করতে হবে?
স্বাভাবিক ব্যক্তি, ব্যতীত অন্য যেকোনো ব্যক্তি যিনি কোনো আইন বা আইনি ক্ষমতা রহিয়াছে এইরূপ কোনো দলিলের অধীন নিগমিত, নিবন্ধিত বা গঠিত তিনি নিম্নবর্ণিত বংসরসমূহে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দাখিলের পরিবর্তে নাম ও টিআইএন সংবলিত প্রত্যয়নপত্র দাখিল করিবেন –
ক) নিগমন, নিবন্ধন বা গঠনের বৎসর
খ) নিগমন, নিবন্ধন বা গঠনের পরের বৎসর
কে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণাদির সঠিকত যাচাই করবেন?
যে ব্যক্তির নিকট রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দাখিল করা হইবে, সেই ব্যক্তি বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত পদ্ধতিতে দাখিলকৃত রিটার্ন দাখিলের প্রমাণাদির সঠিকতা যাচাই করবেন।
রিটার্ন দাখিলের প্রমাণাদির সত্যতা যাচাইয়ে ব্যর্থ হলে কি জরিমানা হবে?
যেইসকল ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দাখিল বাধ্যতামূলক সেইসকল ক্ষেত্রে কোনো নমিনেশন, মনোনয়ন বা আবেদন যাচাই-বাচাই, কোনো লাইসেন্স অনুমোদন, সার্টিফিকেট, সদস্যপদ, অনুমতি, ভর্তি, এজেন্সি বা ডিস্ট্রিবিউটরশিপের অনুমোদন, ঋণ অনুমোদন, ক্রেডিট কার্ড ইস্যু, সংযোগ বা অপারেশন অনুমোদন, নিবন্ধন সম্পাদন বা পেমেন্টের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দাখিল নিশ্চিত করিবেন এবং দাখিলকৃত রিটার্ন দাখিলের প্রমাণাদির সত্যতা যাচাইয়ে ব্যর্থ হলে উক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে উপকর কমিশনার অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকার জরিমানা আরোপ করতে পারবেন।
যুক্তিসঙ্গত শুনানির সুযোগ প্রদান ব্যতিরেকে এই ধারার অধীন জরিমানা আরোপ করা যাবে না।
উপসংহার
বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা কেবল একটি আইনী বাধ্যবাধকতা নয়, বরং এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন সেবা গ্রহণের জন্য একটি প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এই বিষয়ে যথাযথ তথ্য জানা আমাদের সকলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই লেখাটি আপনি বুকমার্ক করে রাখুন এবং আপনার সহকর্মী, পরিবারবর্গ ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। আয়কর সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আমাদের আয়কর বিভাগটি ঘুরে আসতে পারেন।

