Site icon Chartered Journal

অংশীদারী চুক্তিপত্র লেখার নিয়ম

partnership deed

বন্ধু, আত্মীয় বা সহকর্মীর সঙ্গে মিলে ব্যবসা শুরু করা এখন খুব সাধারণ ব্যাপার। একজনের হাতে টাকা, আরেকজনের হাতে অভিজ্ঞতা। দুজন মিলে ভালো কিছু গড়ার স্বপ্ন নিয়েই শুরু হয় পথচলা। কিন্তু লাভ ভাগ নিয়ে মতভেদ, টাকা তোলা নিয়ে সন্দেহ কিংবা কাজের দায়িত্ব নিয়ে ঝগড়া হলে সম্পর্ক ও ব্যবসা দুটোই নষ্ট হয়। এই ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো একটি লিখিত অংশীদারী চুক্তিপত্র।

এই লেখায় আমরা অংশীদারী চুক্তিপত্র কী, এতে কী কী তথ্য থাকবে, একটি বাস্তব নমুনা, স্ট্যাম্প ও নিবন্ধনের বিষয় এবং সই করার আগের সতর্কতাগুলো আলোচনা করব। শেষ পর্যন্ত পড়লে আপনি নিজেই একটি গোছানো চুক্তিপত্রের খসড়া তৈরি করতে পারবেন।

অংশীদারী চুক্তিপত্র কী এবং কেন দরকার

দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মুনাফার উদ্দেশ্যে একসঙ্গে ব্যবসা চালাতে রাজি হলে তাঁদের মধ্যে যে লিখিত সমঝোতা হয়, সেটিই অংশীদারী চুক্তিপত্র। অনেকে একে পার্টনারশীপ চুক্তিপত্র বা পার্টনারশীপ ডিডও বলেন।

বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রচলিত আইন হলো ১৯৩২ সালের অংশীদারি আইন। এই আইন অনুযায়ী অংশীদারি ব্যবসা হলো কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে ব্যবসার মুনাফা ভাগ করে নেওয়ার চুক্তিবদ্ধ সম্পর্ক। অর্থাৎ অংশীদারির ভিত্তিই হলো চুক্তি।

এই চুক্তি লিখিত, মৌখিক বা আচরণগত হতে পারে, তবে ভবিষ্যতের জটিলতা এড়াতে লিখিত চুক্তিই বেশি সুবিধাজনক। মৌখিক কথা পরে প্রমাণ করা কঠিন। তাই লিখিত অংশীদারী চুক্তিপত্র করলে প্রত্যেক পার্টনার জানেন তাঁর অধিকার কী এবং দায়িত্ব কতটুকু।

অংশীদারী চুক্তিপত্রে যেসব তথ্য থাকা জরুরি

একটি ভালো অংশীদারী চুক্তিপত্র স্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ হতে হয়। নিচের বিষয়গুলো বাদ দেবেন না।

এই তালিকা ধরে লিখলে আপনার অংশীদারী চুক্তিপত্র প্রয়োজনীয় সব দিক ছুঁয়ে যাবে।

অংশীদারী চুক্তিপত্রের নমুনা

নিচে একটি সাধারণ নমুনা দেওয়া হলো। বন্ধনীর ভেতরের অংশ আপনার তথ্য দিয়ে পূরণ করুন। এটি একটি খসড়া মাত্র। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী শর্ত পরিবর্তন করতে হতে পারে।

(৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত)

পার্টনারশীপ/অংশীদারী চুক্তিপত্র

তারিখ: [তারিখ]

প্রথম পক্ষ:
নাম: [পূর্ণ নাম], পিতার নাম: [পিতার নাম], জাতীয় পরিচয়পত্র নং: [এনআইডি নম্বর], মোবাইল নম্বর: [মোবাইল নম্বর], বর্তমান ঠিকানা: [ঠিকানা], স্থায়ী ঠিকানা: [ঠিকানা], পেশা: [পেশা]।

দ্বিতীয় পক্ষ:
নাম: [পূর্ণ নাম], পিতার নাম: [পিতার নাম], জাতীয় পরিচয়পত্র নং: [এনআইডি নম্বর], মোবাইল নম্বর: [মোবাইল নম্বর], বর্তমান ঠিকানা: [ঠিকানা], স্থায়ী ঠিকানা: [ঠিকানা], পেশা: [পেশা]।

পক্ষদ্বয় সর্বসম্মতভাবে “[ব্যবসার নাম]” নামক অংশীদারী ব্যবসা পরিচালনায় সম্মত হয়ে নিম্নলিখিত শর্তাবলীতে চুক্তিবদ্ধ হলেন:

১. ব্যবসার নাম ও ঠিকানা: ব্যবসার নাম হবে “[ব্যবসার নাম]” এবং প্রধান কার্যালয় [ঠিকানা]-এ অবস্থিত হবে।

২. ব্যবসার ধরন: [ব্যবসার ধরন, যেমন: ট্রেডিং, সাপ্লাই, সার্ভিস ইত্যাদি]।

৩. মূলধন সরবরাহ:
প্রথম পক্ষ মোট মূলধনের [৫০% / নির্দিষ্ট টাকা] প্রদান করবেন।
দ্বিতীয় পক্ষ মোট মূলধনের [৫০% / নির্দিষ্ট টাকা] প্রদান করবেন।

৪. লাভ-ক্ষতি বণ্টন: ব্যবসায় অর্জিত নিট লাভ এবং উক্ত হিসাবের ক্ষতি উভয় পক্ষ সমহারে ([৫০%:৫০%] অথবা মূলধনের অনুপাতে) বহন ও ভোগ করবেন।

৫. ব্যাংক হিসাব পরিচালনা: যেকোনো তফসিলী ব্যাংকে যৌথ নামে “[ব্যবসার নাম]” হিসাব খোলা হবে এবং এই হিসাবটি প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষ যৌথভাবে অথবা এককভাবে পরিচালনা করতে পারবেন।

৬. দায়িত্ব বণ্টন:
প্রথম পক্ষ [দায়িত্বের বিবরণ, যেমন: হিসাব-নিকাশ ও ফিল্ড ওয়ার্ক] দেখাশোনা করবেন।
দ্বিতীয় পক্ষ [দায়িত্বের বিবরণ, যেমন: অফিস ব্যবস্থাপনা ও মার্কেটিং] দেখাশোনা করবেন।

৭. নতুন অংশীদার ও বিলোপসাধন: কোনো পক্ষের সম্মতি ছাড়া নতুন অংশীদার নেওয়া যাবে না। ব্যবসা বন্ধ করতে চাইলে কমপক্ষে [৩০/৬০] দিন আগে অন্য পক্ষকে লিখিত নোটিশ দিতে হবে।

৮. বিরোধ নিষ্পত্তি: কোনো বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে উভয় পক্ষ প্রথমে আলোচনার মাধ্যমে, না হলে সালিশ বা প্রচলিত আইনের অধীনে বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন।

এতদ্বারা আমরা পক্ষদ্বয় সুস্থ মস্তিষ্কে ও স্বেচ্ছায় এই চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করলাম।

প্রথম পক্ষের স্বাক্ষর: ____________
দ্বিতীয় পক্ষের স্বাক্ষর: ____________

সাক্ষীগণের স্বাক্ষর:
১. ____________ (নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বরসহ)
২. ____________ (নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বরসহ)
৩. ____________ (নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বরসহ)

অংশীদারী চুক্তিপত্রের ৮টি শর্ত সহজ ভাষায়

নমুনার প্রতিটি ধারার পেছনে একটি বাস্তব কারণ আছে। সেগুলো বুঝে নিলে অংশীদারী চুক্তিপত্র নিজের ব্যবসার উপযোগী করে নেওয়া সহজ হবে।

ব্যবসার নাম, ঠিকানা ও ধরন: শুরুতেই ব্যবসার পরিচয় ঠিক করে নিলে ব্যাংক হিসাব, ট্রেড লাইসেন্স ও কর নিবন্ধনে সুবিধা হয়। ধরন লেখার সময় একটু বিস্তৃত রাখুন, যাতে ভবিষ্যতে সামান্য পরিবর্তনে বিবাদ না বাধে।

মূলধন সরবরাহ: কে কত টাকা দেবেন, তা সংখ্যা ও শতাংশ দুইভাবে লেখা ভালো। কেউ টাকার বদলে জমি, যন্ত্রপাতি বা শ্রম দিলে তার মূল্যও চুক্তিতে ঠিক করে লিখে রাখুন।

লাভ-ক্ষতি বণ্টন: সাধারণত মূলধনের অনুপাতে লাভ ভাগ হয়। তবে কেউ বেশি সময় বা দক্ষতা দিলে ভিন্ন হারেও সম্মত হওয়া যায়। লাভের হার যেমন লিখবেন, ক্ষতির হারও তেমন পরিষ্কার লিখুন।

ব্যাংক হিসাব পরিচালনা: যৌথ হিসাবে টাকা তোলার ক্ষমতা নিয়ে আগেই স্পষ্ট নিয়ম রাখুন। বড় অঙ্কের টাকা তুলতে দুই পার্টনারের স্বাক্ষর লাগবে, এমন শর্ত অনেকেই রাখেন। এতে আস্থা বাড়ে।

দায়িত্ব বণ্টন: কে হিসাব দেখবেন, কে বিক্রয় সামলাবেন, তা লিখে রাখলে কাজের ভাগ নিয়ে ঝগড়া কমে।

নতুন অংশীদার ও বিলোপসাধন: সবার সম্মতি ছাড়া নতুন কাউকে ঢোকানো যাবে না, এই শর্ত ব্যবসাকে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ থেকে বাঁচায়। ব্যবসা ছাড়ার জন্য আগাম নোটিশের সময় ঠিক করাও জরুরি।

বিরোধ নিষ্পত্তি: আদালতের আগে আলোচনা ও সালিশের সুযোগ রাখলে সময় ও খরচ দুটোই বাঁচে।

অংশীদারী চুক্তিপত্র কত টাকার স্ট্যাম্পে লিখবেন ও নিবন্ধন

প্রচলিত রীতিতে অংশীদারী চুক্তিপত্র নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লেখা হয়, এবং আমাদের নমুনাটি ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে লেখা। স্ট্যাম্প কিনবেন লাইসেন্সধারী ভেন্ডরের কাছ থেকে। স্ট্যাম্পের মূল্যসহ হালনাগাদ নিয়ম লেখার আগে সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা আইনজীবীর কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।

১৯৩২ সালের অংশীদারি আইন অনুযায়ী অংশীদারি ব্যবসার নিবন্ধন ঐচ্ছিক, কিন্তু চুক্তি অত্যাবশ্যকীয়। তবে নিবন্ধন না করলে কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। যেমন, চুক্তির অধিকার আদায়ে আদালতে মামলা করার ক্ষেত্রে বাধা আসতে পারে। তাই ব্যবসা বড় হলে বা বাইরের পক্ষের সঙ্গে চুক্তি করতে হলে ফার্ম নিবন্ধনের কথা ভাবা ভালো। নিবন্ধনের আবেদন সাধারণত যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও ফার্মসমূহের নিবন্ধকের দপ্তরে করতে হয়। বিস্তারিত নিয়ম ও ফি সেখান থেকে যাচাই করে নিন।

সদস্য সংখ্যার ব্যাপারেও খেয়াল রাখুন। সাধারণ অংশীদারি কারবারে সদস্য সংখ্যা সর্বনিম্ন ২ জন ও সর্বোচ্চ ২০ জন, আর ব্যাংকিং কারবারে সর্বোচ্চ ১০ জন।

অংশীদারী চুক্তিপত্র সই করার আগে ৭টি সতর্কতা

চুক্তিতে সই করার আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই করলে ভবিষ্যতের অনেক ঝামেলা এড়ানো যায়।

১. পার্টনারের আর্থিক সততা ও ব্যবসায়িক সুনাম সম্পর্কে খোঁজ নিন।
২. মূলধন কীভাবে ও কবে জমা হবে, তা তারিখসহ লিখুন।
৩. সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করার নিয়ম রাখুন।
৪. হিসাব দেখার অধিকার যেন সব পার্টনারের থাকে, তা নিশ্চিত করুন।
৫. কোনো পার্টনার মারা গেলে বা অসুস্থ হলে কী হবে, তা চুক্তিতে লিখে রাখুন।
৬. চুক্তির প্রতিটি পাতায় সবার স্বাক্ষর নিন।
৭. সাক্ষীদের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর পরিষ্কার লিখুন এবং প্রত্যেক পক্ষ এক কপি করে রাখুন।

অংশীদারী চুক্তিপত্রে সাধারণ ভুল

অনেকেই কিছু পরিচিত ভুল করেন। প্রথমত, লাভের হার লিখলেও ক্ষতির হার না লেখা। ফলে লোকসান হলে বিবাদ বাধে। দ্বিতীয়ত, ব্যবসা ছাড়ার নিয়ম না রাখা। কেউ হঠাৎ বেরিয়ে গেলে তার পাওনা কীভাবে মিটবে, তা অজানা থেকে যায়।

তৃতীয়ত, শুধু মুখের কথার ওপর নির্ভর করা। সম্পর্ক ভালো থাকলে এটি সমস্যা মনে হয় না, কিন্তু মতভেদ হলে প্রমাণ থাকে না। তাই যত ঘনিষ্ঠ বন্ধুই হোক, অংশীদারী চুক্তিপত্র লিখিত রাখুন। চতুর্থত, ব্যবসা বদলে গেলেও চুক্তি হালনাগাদ না করা। নতুন পণ্য বা সেবা যোগ হলে বা মূলধন বাড়লে চুক্তিতে সংশোধনী যোগ করে নিন।

সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর

অংশীদারী চুক্তিপত্র কী?

দুই বা ততোধিক ব্যক্তি মিলে ব্যবসা চালানোর সময় মূলধন, লাভ-ক্ষতি, দায়িত্ব ও বিরোধ নিষ্পত্তির যে শর্ত লিখিতভাবে ঠিক করেন, সেটিই অংশীদারী চুক্তিপত্র।

অংশীদারী চুক্তিপত্র কি লিখিত হওয়া বাধ্যতামূলক?

আইনে চুক্তি থাকা জরুরি, তবে তা মৌখিকও হতে পারে। ভবিষ্যৎ বিবাদ এড়াতে লিখিত চুক্তিপত্র করাই নিরাপদ।

অংশীদারি ব্যবসার নিবন্ধন কি বাধ্যতামূলক?

১৯৩২ সালের আইন অনুযায়ী নিবন্ধন ঐচ্ছিক। তবে নিবন্ধন না থাকলে আদালতে অধিকার আদায়ে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে, তাই নিবন্ধন করানো ভালো।

অংশীদারি ব্যবসায় সর্বোচ্চ কতজন পার্টনার থাকতে পারেন?

সাধারণ ব্যবসায় সর্বোচ্চ ২০ জন এবং ব্যাংকিং ব্যবসায় সর্বোচ্চ ১০ জন অংশীদার থাকতে পারেন।

শেষকথা

ব্যবসার সাফল্য শুধু পুঁজি বা পরিশ্রমে আসে না, পারস্পরিক বিশ্বাস ও স্বচ্ছতাও দরকার। একটি স্পষ্ট, পূর্ণাঙ্গ ও সাক্ষীসহ অংশীদারী চুক্তিপত্র সেই বিশ্বাসকে কাগজে-কলমে মজবুত করে। এতে মূলধন, লাভ-ক্ষতি, দায়িত্ব ও বিরোধ নিষ্পত্তির নিয়ম আগেই ঠিক থাকে।

উপরের নমুনাটি খসড়া হিসেবে ব্যবহার করুন, নিজের ব্যবসার বাস্তবতা অনুযায়ী শর্ত বদলে নিন এবং স্ট্যাম্প ও নিবন্ধনের বিষয়ে আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন। লেখাটি উপকারী মনে হলে যাঁরা পার্টনারশীপে ব্যবসা শুরু করছেন, তাঁদের সঙ্গে শেয়ার করুন। এটি সাধারণ তথ্যের জন্য লেখা, কোনো আইনি পরামর্শ নয়।

Exit mobile version