আপনি কি একজন প্রবাসী বাংলাদেশি? দেশের বাইরে থেকেও কি নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি কার্ড (NID Card) তৈরি করতে চান? বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিশেষ উদ্যোগে প্রবাসে বসেই এনআইডি নিবন্ধনের সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। জমি কেনাবেচা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে পাসপোর্ট নবায়ন—সব ক্ষেত্রেই এনআইডি এখন অপরিহার্য । আজকের ব্লগে আমরা জানবো কিভাবে সহজে এবং নির্ভুলভাবে বিদেশ থেকে আপনার এনআইডি কার্ডের জন্য আবেদন করবেন।
কেন প্রবাসীদের জন্য এনআইডি জরুরি?
বিদেশের মাটিতে ব্যস্ত জীবনের মাঝেও দেশের সাথে সংযোগ বজায় রাখতে এনআইডি কার্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে:
- বাংলাদেশে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং রেমিট্যান্স সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতে
- ই-পাসপোর্ট (e-Passport) আবেদন বা নবায়ন সহজ করতে
- সরকারি বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে
প্রবাসে এনআইডি নিবন্ধনের ধাপসমূহ
প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়াটি মূলত কয়েকটি সহজ ধাপে সম্পন্ন হয়। নিচে এর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. অনলাইন আবেদন ও প্রোফাইল তৈরি
নিবন্ধন প্রক্রিয়ার প্রথম কাজ হলো বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ওয়েবসাইট (https://services.nidw.gov.bd) ভিজিট করা । এখানে আপনাকে একটি সক্রিয় মোবাইল নম্বর ও ইমেল ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। ফরম-২ (ক) সঠিকভাবে পূরণ করে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদান করুন। মনে রাখবেন, আপনার পাসপোর্টের তথ্যের সাথে অনলাইন আবেদনের তথ্যের মিল থাকা বাধ্যতামূলক ।
২. প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংগ্রহ (Documents Checklist)
আবেদনের সাথে যে ডকুমেন্টগুলো জমা দিতে হবে, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- অনলাইন আবেদন ফরম: পূরণকৃত ফরম-২ (ক)-এর প্রিন্ট কপি।
- জন্ম নিবন্ধন সনদ: অবশ্যই ১৭ ডিজিটের অনলাইন ভেরিফাইড (QR কোডযুক্ত) কপি।
- পাসপোর্টের কপি: সচল বাংলাদেশি পাসপোর্টের কপি। যদি পাসপোর্ট না থাকে বা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়, তবে সংশ্লিষ্ট দেশে বসবাসকারী ৩ জন বাংলাদেশি এনআইডিধারী ব্যক্তির প্রত্যায়নপত্র প্রয়োজন হতে পারে।
- পিতামাতার তথ্য: পিতামাতার এনআইডি কার্ডের কপি বা অনলাইন জন্ম সনদ।
- নাগরিকত্ব সনদ: বাংলাদেশের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি (মেয়র/চেয়ারম্যান) কর্তৃক প্রদত্ত সনদ।
- ঠিকানার প্রমাণ: বাংলাদেশে স্থায়ী ঠিকানার বিপরীতে ইউটিলিটি বিলের কপি বা হোল্ডিং ট্যাক্স রশিদ।
- শিক্ষাগত সনদ: এসএসসি (SSC) বা সমমানের সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বয়স যাচাইয়ের জন্য)।
- ছবি: ১ কপি পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
৩. অ্যাপয়েন্টমেন্ট ও বায়োমেট্রিক প্রদান
অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার পর বায়োমেট্রিক তথ্য (আঙুলের ছাপ, চোখের মণির স্ক্যান বা Iris Scan এবং স্বাক্ষর) প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশি মিশন বা কন্স্যুলেট অফিসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে । নির্ধারিত দিনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করতে হবে। মনে রাখবেন, বায়োমেট্রিক ছাড়া নিবন্ধন সম্পন্ন হবে না ।
৪. মাঠ পর্যায়ে তদন্ত ও অনুমোদন
আপনার বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হওয়ার পর তথ্যগুলো বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাচন অফিসে পাঠানো হয়। সেখানে একজন তদন্ত কর্মকর্তা আপনার স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে তথ্যের সত্যতা যাচাই করবেন । এই তদন্ত প্রতিবেদন সন্তোষজনক হলে নির্বাচন কমিশন আপনার এনআইডি কার্ডের অনুমোদন প্রদান করবে।
বিশেষ এলাকার জন্য নির্দেশিকা (চট্টগ্রাম বিভাগ)
চট্টগ্রাম বিভাগের ৫৬টি উপজেলা ও থানাকে নির্বাচন কমিশন ‘বিশেষ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে । এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের সাধারণ নথিপত্রের বাইরেও ‘বিশেষ তথ্য ফরম’ বা ফরম ২-(খ) পূরণ করতে হয় । এখানে নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে বংশতালিকা বা জমির খতিয়ান অতিরিক্ত হিসেবে চাওয়া হতে পারে।
নিবন্ধন ফি ও সময়সীমা
সাধারণত বাংলাদেশি মিশনগুলোতে এনআইডি সেবার জন্য সরাসরি কোনো ফি বা চার্জ নেওয়া হয় না । তবে বিশেষ কনস্যুলার সেবার ক্ষেত্রে কোনো কোনো মিশনে সামান্য ফি (যেমন দুবাই মিশনে ৫০ দিরহাম) প্রযোজ্য হতে পারে । আবেদনের ধরন ও তদন্ত প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে কার্ড পেতে সাধারণত ২ থেকে ৩ মাস বা তার বেশি সময় লাগতে পারে ।
স্মার্ট কার্ড সংগ্রহ (Delivery)
আবেদন অনুমোদন হয়ে গেলে আপনি অনলাইন পোর্টাল থেকে আপনার ডিজিটাল এনআইডি ডাউনলোড করে ব্যবহার করতে পারবেন । পরবর্তীতে মিশন থেকে হার্ডকপি বা স্মার্ট কার্ড (Smart Card) প্রস্তুত হলে আপনাকে ইমেল বা এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হবে। তখন আপনি সশরীরে বা অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে কার্ডটি সংগ্রহ করতে পারবেন ।
কিছু জরুরি টিপস:
- সাদা পোশাক এড়িয়ে চলুন: বায়োমেট্রিক দেওয়ার দিন সাদা বা হালকা রঙের পোশাক না পরে রঙিন পোশাক পরা ভালো, যাতে ছবি স্পষ্টভাবে আসে ।
- শনাক্তকারী (Identifier): আবেদনের সময় বাংলাদেশে বসবাসকারী এমন একজন ব্যক্তিকে শনাক্তকারী হিসেবে দিন যিনি আপনার পরিচয় ও পরিবারের তথ্য সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানেন ।
- ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড: অনলাইন আবেদনের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ডটি কোথাও লিখে রাখুন, কারণ এটি পরবর্তীতে এনআইডি কার্ড ডাউনলোডের জন্য প্রয়োজন হবে ।
প্রবাসে থেকেও নিজের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে আজই আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন করুন। আরও বিস্তারিত তথ্যের জন্য আপনার নিকটস্থ বাংলাদেশি দূতাবাস বা নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে যোগাযোগ করুন।
সহযোগিতার জন্য হেল্পডেস্ক (নির্বাচন কমিশন):
- হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমো (WhatsApp & IMU): +8801335149920, +8801777770562
- ইমেইল (Email): info@ocv.gov.bd

