Site icon Chartered Journal

ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ২০২৬

electric school bus import duty exemption

শিক্ষার্থী পরিবহনে ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, শুধুমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী পরিবহনের উদ্দেশ্যে কমপক্ষে ১৭ আসনবিশিষ্ট ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে সমুদয় কাস্টমস শুল্ক, ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক, আগাম কর ও অগ্রিম আয়কর থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হবে।

H.S. Code-8702.40.00 এর আওতায় এই বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে। তবে সুবিধাটি সবার জন্য নয় – নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আবেদন করলেই কেবল এই ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা মিলবে।

কেন ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা?

বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সাশ্রয়ী পরিবহন নিশ্চিত করতে এবং পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে। কাস্টমস আইন, ২০২৩ এর ধারা ২৫ এর উপ-ধারা (১), মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ১২৬ এর উপ-ধারা (১) এবং আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ৭৬ এর উপ-ধারা (১) এর ক্ষমতাবলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাথে পরামর্শক্রমে এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনটি ২৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ থেকে কার্যকর এবং ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

কে পাবেন ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা?

এই অব্যাহতি সুবিধা গ্রহণের জন্য আমদানিকারকের প্রকৃতি নিচের যেকোনো একটি হতে হবে:

অর্থাৎ শুধু স্কুল বা কলেজই নয়, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও যদি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির ভিত্তিতে শিক্ষার্থী পরিবহন করে, তারাও এই ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে পারবে।

ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধার জন্য বাসের বৈশিষ্ট্য কী হতে হবে?

প্রজ্ঞাপনে আমদানিযোগ্য বাসের জন্য নির্দিষ্ট কারিগরি ও মানগত শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। আমদানিকৃত বাসটিকে অবশ্যই নিচের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হতে হবে:

  1. বাসটি সম্পূর্ণ নতুন (Brand New) হতে হবে, পুরনো বা রিকন্ডিশন্ড বাস এই সুবিধার আওতায় আসবে না।
  2. কমপক্ষে ১৭ আসনবিশিষ্ট ইলেকট্রিক (Electric) বাস হতে হবে।
  3. বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BRTA) বা অন্য কোনো উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধারিত মানের হতে হবে, অথবা সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারক দেশের Type Approval Authority কর্তৃক সনদপ্রাপ্ত হতে হবে।
  4. ব্যাটারি প্রতিস্থাপন ছাড়াও ন্যূনতম ৭ বছর বা ৩,০০,০০০ কি.মি. চলবে মর্মে ওয়ারেন্টি থাকতে হবে এবং যথাযথ প্রমাণক থাকতে হবে।
  5. বাসের বডির রং হলুদ হতে হবে এবং বাসে স্পষ্টভাবে “School/College/Student Bus/Transport” লেখা থাকতে হবে।
  6. শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য বাসে সিসি ক্যামেরা বা আইপি ক্যামেরা এবং GPS ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকতে হবে।

ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা: ব্যবহার ও বিক্রয়ের বিধিনিষেধ

এই সুবিধায় আমদানি করা বাস কেবলমাত্র শিক্ষার্থী পরিবহনে ব্যবহার করতে হবে। প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আমদানিকৃত ইলেকট্রিক বাস অন্য কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে, ভাড়ায়, লিজে বা রাইড শেয়ারিং সেবায় ব্যবহার করা যাবে না। পাশাপাশি বাসটি অবশ্যই BRTA কর্তৃক স্কুল বাস/কলেজ বাস/শিক্ষার্থী পরিবহন বাস হিসেবে নিবন্ধিত হতে হবে।

আমদানির তারিখ থেকে ন্যূনতম ৫ বছরের মধ্যে বাসটি বিক্রয়, হস্তান্তর বা মালিকানা পরিবর্তন করা যাবে না। তবে বোর্ডের পূর্বানুমোদনক্রমে এবং নির্ধারিত বার্ষিক অবচয় সুবিধা প্রদান করে আমদানিকালে প্রযোজ্য সমুদয় শুল্ক পরিশোধ সাপেক্ষে বিক্রয় বা হস্তান্তর করা সম্ভব।

ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধার জন্য আবেদন পদ্ধতি

এই অব্যাহতি সুবিধা পেতে হলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট সকল দলিলাদিসহ বোর্ডের নিকট আবেদন করতে হবে। আবেদন পাওয়ার পর বোর্ড যাচাই-বাছাইপূর্বক ১০ কার্যদিবসের মধ্যে অব্যাহতির আদেশ জারি করবে বা আবেদন যথাযথ না হলে প্রত্যাখ্যান করতে পারবে। আবেদন অনুমোদিত হলে অব্যাহতির আদেশের কপি এবং আমদানির স্বপক্ষে অন্যান্য দলিলাদিসহ ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি অঙ্গীকারনামা সংশ্লিষ্ট কাস্টমস হাউসের কমিশনারের নিকট দাখিল করতে হবে।

শর্ত লঙ্ঘন হলে কী হবে?

প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হলে ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে কাস্টমস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী প্রযোজ্য শুল্ক-কর জরিমানা ও সুদসহ আদায়যোগ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক ভবিষ্যতে আর এই সুবিধার জন্য বিবেচিত হবে না। আমদানি পরবর্তীতে যেকোনো সময় শর্ত পালন না হওয়ার প্রমাণ পেলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, BRTA বা ট্রাফিক পুলিশের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তথ্য ও প্রমাণকসহ বোর্ডের নিকট প্রতিবেদন পাঠাবেন।

কতদিন পাওয়া যাবে এই শুল্কমুক্ত সুবিধা?

এই প্রজ্ঞাপন ২৭ এপ্রিল ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে এবং ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। অর্থাৎ হাতে সময় খুবই কম। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠান ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিতে চায়, তাদের দ্রুত প্রয়োজনীয় দলিলপত্র প্রস্তুত করে আবেদন করতে হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা কারা পাবেন?

সরকারি বা বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং যেসব প্রতিষ্ঠান কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তির ভিত্তিতে শিক্ষার্থী পরিবহন পুল পরিচালনা করে, তারা এই সুবিধা পাবেন। আমদানিকৃত বাস অবশ্যই H.S. Code-8702.40.00 এর আওতায় কমপক্ষে ১৭ আসনবিশিষ্ট ইলেকট্রিক বাস হতে হবে।

ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে বাসের রং কী হতে হবে?

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী আমদানিকৃত বাসের বডির রং হলুদ হতে হবে এবং বাসে সহজেই দৃষ্টিগোচর হয় এমনভাবে “School/College/Student Bus/Transport” শব্দগুলো স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা থাকতে হবে।

আমদানির পর কি এই ইলেকট্রিক বাস বিক্রি করা যাবে?

আমদানির তারিখ থেকে ৫ বছরের মধ্যে বাসটি বিক্রয় বা হস্তান্তর করা যাবে না। তবে বোর্ডের পূর্বানুমোদন এবং নির্ধারিত অবচয় সুবিধা দিয়ে প্রযোজ্য শুল্ক পরিশোধ সাপেক্ষে বিশেষ পরিস্থিতিতে বিক্রয় বা মালিকানা পরিবর্তন করা যাবে।

ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধার আবেদন কোথায় করতে হবে?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিকট সংশ্লিষ্ট সকল দলিলাদিসহ আবেদন করতে হবে। বোর্ড ১০ কার্যদিবসের মধ্যে আবেদন যাচাই করে অব্যাহতির আদেশ জারি করবে বা প্রত্যাখ্যান করবে। অনুমোদিত হলে সংশ্লিষ্ট কাস্টমস হাউসে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা দাখিল করতে হবে।

এই প্রজ্ঞাপনের মেয়াদ কতদিন এবং শর্ত লঙ্ঘন করলে কী হবে?

প্রজ্ঞাপনটি ২৭ এপ্রিল ২০২৬ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত বলবৎ। কোনো শর্ত লঙ্ঘিত হলে অব্যাহতি বাতিল হবে এবং প্রযোজ্য সমুদয় শুল্ক-কর জরিমানা ও সুদসহ আদায় করা হবে। সেই আমদানিকারক ভবিষ্যতে এই সুবিধার জন্য আর বিবেচিত হবেন না।

উপসংহার

শিক্ষার্থী পরিবহনে ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এতে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবহন ব্যয়ও কমবে। তবে সুবিধাটির মেয়াদ মাত্র ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত, তাই আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আবেদন করতে হবে। ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা সংক্রান্ত যেকোনো জিজ্ঞাসায় সংশ্লিষ্ট কাস্টমস হাউস বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এস.আর.ওটি পেতে এই লিংকে ক্লিক করুন

Exit mobile version