বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ব্যাংক সম্পর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে লেনদেন পরিচালনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা জারি করেছে। এই নীতিমালাটি ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধিত ধারার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা, গ্রাহকদের আস্থা অটুট রাখা এবং এই ধরনের লেনদেনকে স্বচ্ছভাবে পরিচালনা করা। আসুন, এই নির্দেশিকার মূল বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
১. ব্যাংক সম্পর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কারা?
প্রথমেই আমাদের জানতে হবে, ব্যাংক সম্পর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বলতে কাদের বোঝানো হচ্ছে। এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, এর অন্তর্ভুক্ত হলেন:
- ব্যাংকের পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)।
- ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ শেয়ারহোল্ডার অথবা সেই শেয়ারহোল্ডারের সাথে সম্পর্কযুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি।
- পরিবারের সদস্য, যারা ব্যাংকের পরিচালনা বা শেয়ার ধারণের মাধ্যমে প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
- ব্যাংকের কোনো সহযোগী বা অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান।
২. ক্রেডিট সুবিধার ঊর্ধ্বসীমা
ব্যাংক সম্পর্কিত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রদত্ত ক্রেডিট সুবিধার পরিমাণ কোনো অবস্থাতেই ব্যাংকের Tier-1 মূলধনের ১০% এর বেশি হতে পারবে না। যদি কোনো ব্যাংক এই সীমা অতিক্রম করে, তবে অবিলম্বে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই সীমা মেনে চলার জন্য একটি পরিকল্পনা দাখিল করতে হবে।
৩. লেনদেনের শর্তাবলী
ব্যাংক যখন এই শ্রেণির ব্যক্তিদের সাথে কোনো প্রকার লেনদেন করবে, তখন লেনদেনের শর্তাবলী অবশ্যই এমন হতে হবে যা ব্যাংকের অন্যান্য সাধারণ গ্রাহকদের তুলনায় কোনোভাবেই বেশি সুবিধাজনক না হয়। অর্থাৎ, ঋণের সুদের হার, বিভিন্ন প্রকার কমিশন, ফি, জামানতের প্রকৃতি ও পরিমাণ, মার্জিন ইত্যাদি সবকিছু অন্যান্য গ্রাহকদের মতোই হতে হবে।
৪. ব্যাংক পরিচালকদের জন্য বিশেষ নিয়ম
ব্যাংকের পরিচালক বা সিইও-দের জন্য ব্যাংক থেকে কোনো ধরনের ক্রেডিট সুবিধা প্রদান সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তারা ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের মতো কিছু সুবিধা পেলেও, ঋণের ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ সুবিধা পাবেন না। এমনকি ব্যাংক পরিচালকদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হবে, যদি না পর্যাপ্ত জামানত প্রদান করা হয়।
৫. সম্পর্কিত ব্যাংক-ইনস্টিটিউটদের জন্য বিশেষ বিধান
যদি কোনো ব্যাংক সম্পর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অন্য কোনো কোম্পানির ২০% বা তার বেশি শেয়ারের মালিক হয়, তবে সেই প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে ব্যাংকের ‘সম্পর্কিত’ হিসেবে গণ্য করা হবে। ব্যাংক যদি এই ধরনের কোনো প্রতিষ্ঠানের সাথে কোনো লেনদেন করে, তবে সেই তথ্য অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে।
৬. গ্যারান্টি ও জামানত
ব্যাংক সম্পর্কিত ব্যক্তিদের ঋণ বা অন্য কোনো ক্রেডিট সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই পর্যাপ্ত জামানত থাকতে হবে। এই জামানত হিসেবে ব্যাংক ডিপোজিট, স্বর্ণ, জমি, বিল্ডিং অথবা শেয়ার মার্কেটে তালিকাভুক্ত শেয়ার গ্রহণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি, ব্যক্তিগত গ্যারান্টিও নিশ্চিত করতে হবে।
৭. আর্থিক লেনদেন ও অনুশাসনের সংশোধন
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নতুন নির্দেশিকা ব্যাংক সম্পর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মকানুন আরোপ করেছে। যেকোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন, বিশেষ করে ঋণ মওকুফ বা মুনাফা মওকুফের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
৮. ঋণের সুদের হার ও মুনাফা মওকুফ
ব্যাংক সম্পর্কিত ব্যক্তিদের ঋণের সুদের হার বা মুনাফা মওকুফের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি অত্যাবশ্যক। তবে, যদি ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের পরিচালক না হন, সেক্ষেত্রে ঋণের শর্তাবলীতে কোনো পরিবর্তন আনতে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিতে হবে।
৯. অবাধ লেনদেনের জন্য আবেদন
ব্যাংক সম্পর্কিত ব্যক্তিদের ঋণ বা ক্রেডিট সুবিধা দেওয়ার জন্য ব্যাংকগুলোকে একটি নির্দিষ্ট ফর্ম পূরণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এই ফর্মে ঋণের পরিমাণ, জামানতের বিবরণ, গ্যারান্টি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করতে হবে।
১০. উল্লেখযোগ্য শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নিয়ম
যদি ব্যাংকের কোনো উল্লেখযোগ্য শেয়ারহোল্ডার এবং তার পরিবার বা তাদের সাথে সম্পর্কিত কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যাংক থেকে কোনো ক্রেডিট সুবিধা গ্রহণ করে, তবে সেই তথ্য ব্যাংক কর্তৃক সঠিকভাবে নথিবদ্ধ করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাতে হবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ব্যাংক সম্পর্কিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে ব্যাংকের লেনদেন সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নীতিমালা একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই নিয়মগুলি ব্যাংকের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং গ্রাহকদের আস্থা বজায় রাখতে সহায়ক হবে। ব্যাংকগুলোর উচিত এই নির্দেশিকাগুলি যথাযথভাবে অনুসরণ করা, যা কেবল তাদের স্বার্থেই নয়, বরং ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য। বাংলাদেশ ব্যাংক কতৃক জারিকৃত এই লেনদেন নীতিমালা ডাউনলোড করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট ভিজিট করুন অথবা এই লিংকে ক্লিক করুন।

