সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের স্বর্ণের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। ইতিহাসে এই প্রথমবার প্রতি ভরি স্বর্ণের দাম ২ লাখ ৯ হাজার ১০০ টাকা (২২ ক্যারেট) ছাড়িয়ে গেছে। এই মূল্য বৃদ্ধি শুধু বাংলাদেশের বাজারের জন্য নয়, এটি বিশ্বজুড়ে চলমান স্বর্ণের বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধিরই প্রতিফলন। কিন্তু হঠাৎ করে কেন এমনটা হলো? আসুন, এর পেছনের প্রধান ৫টি কারণ জেনে নিই।
১. বিশ্ববাজারে স্বর্ণের রমরমা অবস্থা
সারাদেশে স্বর্ণের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ হলো বিশ্ববাজারে সোনার দাম বেড়ে যাওয়া। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স (প্রায় ৩১.১ গ্রাম) স্বর্ণের দাম ৪,০০০ ডলারের উপরে উঠে গেছে।
কেন সোনার দাম বাড়ছে?
- মার্কিন সুদের হার কমানোর প্রত্যাশা: যুক্তরাষ্ট্রে সুদের হার কমানোর সম্ভাবনা থাকলে, ডলারের মূল্য কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা ডলারের পরিবর্তে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝোঁকেন, যা দাম বাড়িয়ে দেয়।
- অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ (যেমন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইসরায়েল-গাজা সংঘাত) এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ছেড়ে সোনার নিরাপদ আশ্রয়ে চলে আসে।
২. যুদ্ধ ও অনিশ্চয়তায় নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণ
অর্থনৈতিক মন্দা বা বড় ধরনের বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়ে স্বর্ণের চাহিদা বাড়ে। স্বর্ণকে ঐতিহাসিকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ (Safe-Haven) মনে করা হয়, কারণ কঠিন সময়েও এটি তার মূল্য ধরে রাখে বা বাড়িয়ে দেয়।
যুদ্ধ বা রাজনৈতিক সংকটের মতো পরিস্থিতিতে যখন অন্যান্য সম্পদের দাম পড়ে যায়, তখন বিনিয়োগকারীরা তাদের পুঁজি সুরক্ষিত রাখতে বিপুল পরিমাণে স্বর্ণ মজুত করেন।
৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণে সোনা কেনা
বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে পোল্যান্ড, তুরস্ক, ভারত এবং চীন-এর মতো দেশগুলো গত কয়েক বছর ধরে বিপুল পরিমাণ সোনা কিনছে।
২০২২ সাল থেকে, বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে ১,০০০ টনেরও বেশি সোনা কিনছে, যা আগের তুলনায় অনেক বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর এই বিশাল স্বর্ণ ক্রয় আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
৪. টাকার মান কমে যাওয়া
আন্তর্জাতিক দাম বাড়ার পাশাপাশি, টাকার অবমূল্যায়ন বা ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়াও দেশে স্বর্ণের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ।
২০২১ সাল থেকে টাকার মূল্য মার্কিন ডলারের বিপরীতে প্রায় ৪৩ শতাংশ কমে গেছে। ফলে বিদেশ থেকে সোনা আমদানি করতে এখন অনেক বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে। আমদানি সীমিত হলেও, আন্তর্জাতিক দামের সঙ্গে তাল মেলাতে স্থানীয় বাজারেও দাম বাড়াতে হয়।
৫. চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ
বাংলাদেশে প্রতি বছর সোনার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২০-৪০ টন। তবে এর ৮০ শতাংশই আসে অনানুষ্ঠানিক বা চোরাচালানের মাধ্যমে। যদিও বৈধ পথে সোনার আমদানি কিছুটা বেড়েছে, তবুও তা দেশের মোট চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
বিশেষ করে বিয়ে এবং উৎসবের মৌসুমে স্বর্ণের চাহিদা বহুগুণ বেড়ে যায়। চাহিদার তুলনায় স্বর্ণের সরবরাহ কম হওয়ায় দেশের বাজারে এই মূল্যবান ধাতুটির দাম সব সময়ই চড়া থাকে।
শেষকথা
মোটকথা, বিশ্বজুড়ে স্বর্ণের রেকর্ড দাম এবং দেশে টাকার অবমূল্যায়ন – এই দুটি মূল কারণের প্রভাবেই বাংলাদেশের জুয়েলার্স সমিতি (বাজুস)-কে বাধ্য হয়ে স্বর্ণের মূল্য নতুন করে নির্ধারণ করতে হয়েছে। এই ঐতিহাসিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের জন্য সোনা কেনা এখন অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।

