ব্যবসা পরিচালনা এবং ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে মূসক-৬.১০ (VAT-6.10) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর ভ্যাট অনলাইন সিস্টেম বা eVAS-এ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং ভ্যাট ফাঁকি রোধে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
অনেক ব্যবসায়ীই বিভ্রান্তিতে থাকেন-কখন এই ফর্মটি জমা দিতে হবে, বা ২ লক্ষ টাকার হিসাবটি ভ্যাটসহ নাকি ভ্যাট ছাড়া হবে? আজকের এই ব্লগে আমরা বিধি ৪২ এবং ভ্যাট আইনের আলোকে এই বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করব।
মূসক-৬.১০ আসলে কী?
সহজ কথায়, মূসক-৬.১০ হলো বড় অঙ্কের ক্রয় বা বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্যের একটি বিবরণী। এনবিআর (NBR)-এর নিয়ম অনুযায়ী, কোনো করমেয়াদে যদি বড় অঙ্কের লেনদেন হয়, তবে ভ্যাট রিটার্ন (VAT-9.1) দাখিলের আগেই সরকারকে সেই লেনদেনের তথ্য জানাতে হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো-রিটার্নের তথ্য যাচাই করা সহজ করা এবং ঝুঁকিভিত্তিক অডিট (Audit) কার্যকর করা।
কারা VAT-6.10 জমা দেবেন?
ভ্যাট আইনের আওতায় নিবন্ধিত সকল ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানকে (Registered Person) এই ফর্ম জমা দিতে হবে, যদি তাদের লেনদেন নির্দিষ্ট সীমার উপরে যায়। অর্থাৎ, আপনি যদি ভ্যাট নিবন্ধিত হন এবং আপনার ব্যবসায় বড় অঙ্কের ক্রয়-বিক্রয় থাকে, তবে এটি আপনার জন্য বাধ্যতামূলক।
কখন VAT-6.10 দাখিল করা বাধ্যতামূলক?
বিধি ৪২ এবং এনবিআর-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, মূসক-৬.১০ দাখিল করা বাধ্যতামূলক যখন:
কোনো করমেয়াদে (এক মাসে) একটি বা একাধিক চালানের মাধ্যমে পণ্য বা সেবা ক্রয় বা বিক্রয় করা হয় এবং সেই চালানের মোট সরবরাহ মূল্য (ভ্যাট ব্যতীত) ২,০০,০০০ (দুই লক্ষ) টাকার বেশি হয়।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: এখানে অনেকে ভুল করেন। ২ লক্ষ টাকার সীমাটি ভ্যাটসহ মোট মূল্য নয়। এটি হবে ভ্যাট ছাড়া সরবরাহ মূল্য (Taxable Value)।
রেফারেন্স: মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ২ এর উপধারা (৭৮) এবং বিধি ৪২ অনুযায়ী, করযোগ্য মূল্য বা সরবরাহ মূল্যকেই এখানে ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে।
ভ্যাট রিটার্ন (VAT-9.1) এবং মূসক-৬.১০ এর সম্পর্ক
বর্তমান eVAS সিস্টেমে মূসক-৬.১০ এবং মাসিক রিটার্ন (VAT-9.1) ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
- জমা দেওয়ার সময়: ভ্যাট রিটার্ন (VAT-9.1) দাখিল করার পূর্বে মূসক-৬.১০ দাখিল করতে হয়।
- অনলাইন সিস্টেমের নিয়ম: আপনি যখন অনলাইনে রিটার্ন সাবমিট করতে যাবেন, তখন part-2 সেকশনে একটি প্রশ্ন আসবে:
- “2b. Do you have any transactions (sales or purchases) above 2 lakh taka for this tax period?”
- যদি আপনার ২ লক্ষ টাকার বেশি লেনদেন থাকে, তবে ‘Yes’ সিলেক্ট করে মূসক-৬.১০ এর তথ্য আপলোড করতে হবে।
- যদি না থাকে, তবে ‘No’ সিলেক্ট করে সরাসরি রিটার্ন দাখিল করা যাবে।
মূলত, মূসক-৬.১০ সাবমিট না করলে সিস্টেম আপনাকে চূড়ান্ত রিটার্ন (VAT-9.1) সাবমিট করতে দেবে না।
যারা সফটওয়্যার বা POS ব্যবহার করেন তাদের ক্ষেত্রে নিয়ম
যেসকল প্রতিষ্ঠান এনবিআর (NBR) অনুমোদিত সফটওয়্যার, POS (Point of Sale) বা ECR মেশিন ব্যবহার করেন, তাদের জন্য একটি বিশেষ ছাড় রয়েছে।
যদি আপনার সফটওয়্যার থেকে ক্রয়-বিক্রয়ের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে এনবিআর-এর সেন্ট্রাল সার্ভারে (eVAS) চলে যায় এবং সেটি এনবিআর গাইডলাইন অনুযায়ী অনুমোদিত হয়, তবে আপনাকে আলাদাভাবে ম্যানুয়ালি VAT-6.10 জমা দিতে হবে না। কারণ, সিস্টেম ইতিমধ্যেই আপনার বড় লেনদেনের তথ্য পেয়ে যাচ্ছে।
অনলাইনে সম্ভব না হলে করণীয় কী?
সাধারণত পুরো প্রক্রিয়াটি eVAT system পোর্টালে অনলাইনে সম্পন্ন হয়। তবে কোনো কারিগরি ত্রুটি বা ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে যদি অনলাইনে দাখিল করা সম্ভব না হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট সার্কেল অফিসে গিয়ে ভ্যাট কর্মকর্তার কাছে ম্যানুয়ালি (কাগজের ফর্মে) এই বিবরণী জমা দেওয়া যাবে।
একনজরে মনে রাখার বিষয়গুলো (Summary)
- সীমা: ২ লক্ষ টাকার বেশি (ভ্যাট ছাড়া)।
- সময়: মাসিক রিটার্ন দাখিলের আগে।
- হিসাব: একক চালান বা একাধিক চালান মিলিয়ে যদি মূল্যসীমা অতিক্রম করে।
- ব্যর্থতায়: মূসক-৬.১০ ছাড়া মাসিক রিটার্ন দাখিল অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যা পরবর্তীতে জরিমানা বা অডিটের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সঠিক সময়ে মূসক-৬.১০ দাখিল করে আপনার প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট কমপ্লায়েন্স বজায় রাখুন এবং আইনি ঝামেলা এড়িয়ে চলুন।
আপনার ভ্যাট সংক্রান্ত যেকোনো জটিলতা এড়াতে একজন পেশাদার ভ্যাট কনসালটেন্ট বা ট্যাক্স আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

