সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট আয়কর কর্তন নিয়ে অনেক ঠিকাদার ও সরকারি কর্মকর্তার মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। সঠিক নিয়ম না জানলে বিল পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয় এবং আইনি ঝামেলায় পড়তে হয়।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদেশ জারি করেছে। এই আদেশে সকল ক্রয়কারীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, বিভিন্ন ক্রয়কার্যের বিল থেকে উৎসে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও আয়কর (আইটি) কর্তন করতে হবে।
এই আদেশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) নীতি উইং কর্তৃক প্রদত্ত মতামতের ভিত্তিতে ভ্যাট ও আয়কর কর্তনের সুস্পষ্ট পদ্ধতি বর্ণনা করা হয়েছে। এই আর্টিকেলে আমরা সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট আয়কর কর্তনের পুরো প্রক্রিয়া সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করব।
সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট আয়কর কর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ অনুযায়ী সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট কর্তন বাধ্যতামূলক। একইভাবে আয়কর আইন অনুযায়ী উৎসে আয়কর কর্তনও করতে হয়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ঠিকাদারেরা বিল জমা দেওয়ার সময় ভ্যাটসহ মোট পরিমাণ উল্লেখ করেন। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা সঠিক হিসাব না জানায় ভুলভাবে কর কর্তন করেন। এতে ঠিকাদার ও সরকার উভয়পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হন।
সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট আয়কর কর্তন সঠিকভাবে করা প্রয়োজন কারণ:
- জাতীয় রাজস্ব সংগ্রহ নিশ্চিত হয়
- ঠিকাদারের নায্য পাওনা নিশ্চিত থাকে
- সরকারি দপ্তর আইনি জটিলতা থেকে মুক্ত থাকে
- অডিট আপত্তি এড়ানো যায়
ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি
সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট আয়কর কর্তনের প্রথম ধাপ হলো ভিত্তিমূল্য (Base Value) নির্ধারণ করা।
চুক্তি অনুসারে যদি মোট পরিশোধিত বিলের মধ্যে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে উক্ত বিল থেকে প্রযোজ্য হারে ভ্যাট বাদ দিয়ে ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
সহজ ভাষায়: ভিত্তিমূল্য = ভ্যাটসহ বিল – ভ্যাট
এই ভিত্তিমূল্যের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে আয়কর কর্তন করা হয়। তাই ভিত্তিমূল্য নির্ধারণে কোনো ভুল করলে পুরো হিসাবই ভুল হয়ে যায়।
সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট কর্তনের সঠিক হিসাব পদ্ধতি
মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ২ (২৯) অনুযায়ী, চুক্তিমূল্য ভ্যাট Inclusive হলে ভ্যাট নিরূপণের জন্য কর ভগ্নাংশ (Tax Fraction) পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
হিসাবটি এভাবে করতে হয়:
ভ্যাট = বিল × ভ্যাট হার / (১০০ + ভ্যাট হার)
উদাহরণস্বরূপ, যদি মোট বিল ১০০ টাকা এবং ভ্যাটের হার ১০% হয়, তাহলে:
ভ্যাট = ১০০ × ১৫ / (১০০ + ১৫) = ১৫০০/১১৫ = ১৩.০৪ টাকা
এই পদ্ধতিতে সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট আয়কর কর্তন সঠিকভাবে করা সম্ভব।
আয়কর কর্তনের পদ্ধতি
ভিত্তিমূল্য নির্ধারণের পর উৎসে আয়কর কর্তনের পালা। আয়কর কর্তনের ক্ষেত্রে নিচের সূত্র অনুসরণ করতে হবে:
- ভিত্তিমূল্য = ভ্যাটসহ বিল – ভ্যাট
- উৎসে কর্তনযোগ্য আয়কর = ভিত্তিমূল্য × আয়কর হার (%)
- ঠিকাদারকে নীট প্রদেয় = (ভ্যাটসহ বিল – ভ্যাট) – আয়কর
অর্থাৎ ঠিকাদার শেষ পর্যন্ত যা পাবেন, তা হলো মোট বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর বাদ দেওয়ার পরের অংক।
NBR নির্দেশিত পূর্ণাঙ্গ হিসাব টেবিল:
| ক্রমিক | বিষয় | সূত্র | উদাহরণ (১০০ টাকার বিলে) |
|---|---|---|---|
| ১ | মোট বিলের পরিমাণ (A) | মোট বিল | ১০০.০০ টাকা |
| ২ | ভ্যাট কর্তন ১৫% (B) | B = A×১৫/(১০০+১৫) | ১৩.০৪ টাকা |
| ৩ | ভিত্তিমূল্য (C) | C = A – B | ৮৬.৯৬ টাকা |
| ৪ | আইটি ৫% (D) | D = C×০.০৫ | ৪.৩৫ টাকা |
| ৫ | ঠিকাদারকে নীট প্রদেয় (E) | E = C – D | ৮২.৬১ টাকা |
এই টেবিলটি LGED অফিস আদেশে সংযুক্ত উদাহরণ থেকে নেওয়া হয়েছে।
NBR নির্দেশিত Tax Fraction পদ্ধতি অনুসরণ করে তৈরি আমাদের ফ্রি ক্যালকুলেটরে শুধু বিলের পরিমাণ ও হার লিখুন – এক ক্লিকেই পেয়ে যাবেন:
- ভ্যাট কর্তনের সঠিক পরিমাণ (VDS)
- আয়কর কর্তনের সঠিক পরিমাণ (TDS)
- ঠিকাদারকে নীট প্রদেয় অর্থের পরিমাণ
- ফলাফল Excel-এ ডাউনলোড করার সুবিধা
👇 এখনই হিসাব করুন: 🔗 এখানে ক্লিক করুন → TDS ও VDS ক্যালকুলেটর
সরকারি বিল পরিশোধে সাধারণ ভুলগুলো
সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট আয়কর কর্তনের ক্ষেত্রে প্রায়ই কিছু ভুল হয়ে থাকে। এসব ভুল এড়াতে নিচের বিষয়গুলো মাথায় রাখা দরকার:
সাধারণ ভুলগুলো হলো:
- মোট বিলের উপর সরাসরি আয়কর হিসাব করা (ভ্যাট বাদ না দিয়ে)
- ভ্যাট ইনক্লুসিভ ও ভ্যাট এক্সক্লুসিভ বিলের মধ্যে পার্থক্য না বোঝা
- কর ভগ্নাংশ পদ্ধতি ব্যবহার না করা
- চুক্তিতে ভ্যাটের বিষয়টি স্পষ্ট না থাকলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা না নেওয়া
এই ভুলগুলো করলে ঠিকাদার বেশি কর দিতে বাধ্য হন বা সরকার কম কর পায়। উভয় ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি হয়।
Inclusive ও Exclusive VAT এর পার্থক্য
সরকারি বিলে ভ্যাট দুইভাবে থাকতে পারে – ভ্যাট ইনক্লুসিভ ও ভ্যাট এক্সক্লুসিভ। এই পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
সরকারি টেন্ডার বা পিপিআর অনুযায়ী ঠিকাদারেরা সাধারণত যে দর (Rate) উদ্ধৃত করেন তা ভ্যাট ও ট্যাক্সসহ (Inclusive) হয়ে থাকে। তাই বিল থেকে ভ্যাটের অংক বের করতে কর ভগ্নাংশ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়।
কাস্টমস কমিশনারেট থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ঠিকাদারের দাখিলকৃত বিলটি যদি ভ্যাটসহ (Inclusive VAT) হয়, তাহলে কর ভগ্নাংশ পদ্ধতিতে ভ্যাট বের করতে হবে। আর যদি বিলটি ‘ভ্যাট বাদে’ (Exclusive VAT) হয়, তাহলে সরাসরি ভ্যাটের হার গুণ করে ভ্যাট নির্ধারণ করতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: যদি কোনো সরবরাহের মূল্য ২০০ টাকা এবং প্রযোজ্য ভ্যাট ১৫% হয়, তাহলে ভ্যাটসহ মোট মূল্য (বা পণ) হবে ২৩০ টাকা।
আবার ভ্যাটসহ পণ ২০০ টাকা হলে কর ভগ্নাংশ পদ্ধতিতে ভ্যাট বাদ দিলে ভ্যাট ব্যতীত সরবরাহ মূল্য হবে ১৭৪ টাকা এবং ভ্যাট হবে ২৬ টাকা।
চুক্তিতে ভ্যাটের উল্লেখ না থাকলে কী করবেন
অনেক পুরনো চুক্তিতে বা কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাটের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে না। এক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট আয়কর কর্তন কিভাবে করবেন?
NBR নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো চুক্তিতে মূসকের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী চুক্তিমূল্যকে ভ্যাট Inclusive ধরে হিসাব করতে হবে।
অর্থাৎ, ভ্যাটের উল্লেখ না থাকলেও ধরে নিতে হবে যে ভ্যাট বিলের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত আছে। এরপর কর ভগ্নাংশ পদ্ধতি ব্যবহার করে ভ্যাট বের করতে হবে।
এছাড়া চুক্তি বাস্তবায়নকালে ভ্যাট ও আইটির হার পরিবর্তন হলে পিপিআর ২০২৫ এর বিধি ৫০ (১৬) প্রযোজ্য হবে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট কিভাবে হিসাব করতে হয়?
উত্তর: মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর ধারা ২(২৯) অনুযায়ী কর ভগ্নাংশ পদ্ধতি ব্যবহার করে ভ্যাট হিসাব করতে হয়। সূত্র: ভ্যাট = বিল × ভ্যাট হার / (১০০ + ভ্যাট হার)।
প্রশ্ন: ভিত্তিমূল্য কি এবং কিভাবে নির্ধারণ করতে হয়?
উত্তর: ভিত্তিমূল্য হলো ভ্যাটসহ মোট বিল থেকে ভ্যাটের অংক বাদ দেওয়ার পর যে মূল্য পাওয়া যায়। সূত্র: ভিত্তিমূল্য = ভ্যাটসহ বিল – ভ্যাট।
প্রশ্ন: ঠিকাদারকে নীট কত টাকা প্রদান করতে হয়?
উত্তর: ভ্যাটসহ মোট বিল থেকে ভ্যাট ও আয়কর বাদ দেওয়ার পর যে পরিমাণ থাকে তা ঠিকাদারকে নীট প্রদান করতে হয়। সূত্র: নীট প্রদেয় = (ভ্যাটসহ বিল – ভ্যাট) – আয়কর।
প্রশ্ন: চুক্তিতে ভ্যাটের উল্লেখ না থাকলে কী করতে হবে?
উত্তর: চুক্তিতে ভ্যাটের বিষয়টি স্পষ্ট না থাকলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী চুক্তিমূল্যকে ভ্যাট Inclusive ধরে হিসাব করতে হবে।
প্রশ্ন: আয়কর কোন মূল্যের উপর কর্তন করতে হয়?
উত্তর: ভ্যাটসহ বিল থেকে ভ্যাটের অংক বাদ দেওয়ার পর যে ভিত্তিমূল্য পাওয়া যায়, সেই ভিত্তিমূল্যের উপর প্রযোজ্য হারে উৎসে আয়কর কর্তন করতে হয়।
উপসংহার
সরকারি ক্রয়ে ভ্যাট আয়কর কর্তন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ যা সঠিকভাবে করা না হলে আইনি জটিলতা সৃষ্টি হয়। LGED অফিস আদেশ ও NBR নির্দেশনা অনুসরণ করে এই কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
মনে রাখবেন: ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ সঠিক না হলে আয়কর কর্তনও সঠিক হবে না। তাই প্রথমে কর ভগ্নাংশ পদ্ধতিতে ভ্যাট বের করুন, তারপর ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ করুন এবং সেই ভিত্তিমূল্যের উপর আয়কর কর্তন করুন।
আপনার দপ্তরে যদি এই বিষয়ে কোনো জটিলতা থাকে, তাহলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটের সাথে পরামর্শ করুন।

