প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় এলেই অনেকের মনে একই প্রশ্ন জাগে, কোন আয়ের হিসাব কীভাবে করব, কোন বিনিয়োগে কর রেয়াত পাওয়া যায়, আর রিটার্ন ফরমটাই বা কীভাবে পূরণ করব। এই বিভ্রান্তি দূর করতেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রতি বছর প্রকাশ করে আয়কর নির্দেশিকা, আর এবছরের সংস্করণ হলো আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭।
এই নির্দেশিকাটি বিশেষভাবে স্বাভাবিক ব্যক্তি (Individual) করদাতাদের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে রিটার্ন পূরণের সাধারণ নিয়মাবলী থেকে শুরু করে করযোগ্য আয় নিরূপণ, কর নির্ধারণ পদ্ধতি, কর দায়, কর রেয়াত, সারচার্জ এবং উৎসে কর কর্তন পর্যন্ত সবকিছু সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে, সঙ্গে দেওয়া আছে বাস্তব উদাহরণও। যারা নিজে রিটার্ন দাখিল করতে চান কিংবা নিজের করদায় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতে চান, তারা অবশ্যই আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ ভালোভাবে পড়বেন।
আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
আয়কর আইন ও বিধিমালার ভাষা অনেক সময় সাধারণ করদাতার কাছে জটিল মনে হয়। এই জটিলতা দূর করার লক্ষ্যেই NBR প্রতি বছর একটি গাইডলাইন প্রকাশ করে, যাতে করদাতারা নিজে নিজেই সহজভাবে রিটার্ন পূরণ করতে পারেন। আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, অর্থ আইন, ২০২৬ এর মাধ্যমে আয়কর আইন, ২০২৩ এ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে এবং “উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৪” বাতিল করে “উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৬” চালু করা হয়েছে, যা ১ জুলাই, ২০২৬ থেকে কার্যকর।
এছাড়া রাজস্ব ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশনের অংশ হিসেবে www.etaxnbr.gov.bd প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘরে বসেই ই-রিটার্ন দাখিল, সার্টিফিকেট প্রাপ্তি এবং এ-চালানের মাধ্যমে কর পরিশোধের সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ এর বিষয়বস্তু
আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ এ একজন ব্যক্তি করদাতার আয়কর রিটার্ন দাখিলের নিয়মাবলী উদাহরণসহ ব্যাখা দেওয়া হয়েছে। যাহাতে সাধারণ করদাতা যাদের আইনের জটিল বিষয় সহজে বোধগম্য হয় এবং নিজেই নিজের রিটার্ন দাখিল করতে পারেন। একজন করদাতা আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ থেকে যে যে তথ্য পাবেন তার সংক্ষিপ্ত তালিকা এখানে উল্লেখ করলাম।
রিটার্ন দাখিল সংক্রান্ত মৌলিক নিয়মাবলী
আয়কর নির্দেশিকার প্রথম ভাগে রিটার্ন দাখিল সম্পর্কিত সাধারণ বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:
- আয়বর্ষ ও করবর্ষের সংজ্ঞা এবং পার্থক্য
- কোন কোন করদাতার জন্য রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক
- আবশ্যিকভাবে রিটার্ন দাখিল করতে হবে এমন ক্ষেত্রসমূহ
- রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা
- করবর্ষ পরবর্তী সময়ে স্বপ্রণোদিতভাবে বা নোটিশের প্রেক্ষিতে রিটার্ন দাখিলের নিয়ম
- অনলাইনে রিটার্ন দাখিল সংক্রান্ত বিশেষ আদেশ
- রিটার্ন দাখিল না করলে যেসব পরিণাম ভোগ করতে হতে পারে
এই অংশটি বিশেষভাবে নতুন করদাতাদের জন্য উপকারী, কারণ অনেকেই জানেন না ঠিক কখন এবং কীভাবে রিটার্ন দাখিল করা বাধ্যতামূলক হয়ে যায়।
স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার রিটার্ন প্রক্রিয়া
দ্বিতীয় ভাগে রয়েছে রিটার্ন সংক্রান্ত খুঁটিনাটি তথ্য। এই অংশে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:
- কর নির্ধারণ পদ্ধতি ও রিটার্নের প্রকারভেদ (রিটার্ন-আইটি ঘ ও আইটি ১১গ)
- আয় কী এবং আয়ের খাতসমূহ কী কী
- মোট আয়ের সংজ্ঞা
- ফার্ম বা ব্যক্তিসংঘ হতে প্রাপ্ত আয় মোট আয়ের অন্তর্ভুক্ত হবে কিনা
- স্বামী-স্ত্রী বা অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের আয় মোট আয়ের সাথে যুক্ত হবে কিনা
- আয়কর পরিগণনার নিয়ম ও কর রেয়াত
- কর রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের সারণী
- জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বিবরণী এবং পরিসম্পদ, দায় ও ব্যয়ের বিবরণী
এই অংশে দেওয়া উদাহরণগুলো একজন সাধারণ করদাতাকে নিজের হাতে রিটার্ন পূরণ করার আত্মবিশ্বাস দেবে।
বিভিন্ন খাতের আয় কীভাবে নিরূপণ করবেন
আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ এর তৃতীয় ভাগে সবচেয়ে বেশি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে আয়ের বিভিন্ন খাত নিয়ে। এতে রয়েছে:
- চাকরি হতে আয় এবং পারকুইজিট, ভাতা ও সুবিধাদির আর্থিক মূল্য নির্ধারণ
- কমিশনারি স্টোর স্কিম হতে অর্জিত আয়
- সরকারি বেতন আদেশভুক্ত কর্মচারীর বেতন খাতে আয় নিরূপণ
- বাড়িভাড়া হতে আয়
- কৃষি হতে আয়
- ব্যবসা বা পেশা হতে আয়
- মূলধনী আয় ও আর্থিক পরিসম্পদ হতে আয়
- অন্যান্য উৎস হতে আয়
প্রতিটি খাতের জন্য আলাদা নিয়ম ও হিসাব পদ্ধতি রয়েছে, যা এই নির্দেশিকায় উদাহরণসহ স্পষ্ট করা হয়েছে।
কর দায় পরিগণনা ও রেয়াত সংক্রান্ত বিস্তারিত
চতুর্থ ভাগে রয়েছে করদায় হিসাবের মূল কাঠামো। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো:
- মোট আয়ের উপর আরোপযোগ্য আয়কর হিসাব
- মোট আয় ও কর নির্ধারণের ধাপসমূহ
- ন্যূনতম কর সংক্রান্ত নিয়ম
- আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ৭৮ অনুযায়ী বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত এবং রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগের খাত
- কর প্রত্যর্পণ ও অতিরিক্ত কর
- স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার সারচার্জ
- মোটরযানের মালিক হিসেবে প্রযোজ্য অগ্রিম কর ও পরিবেশ সারচার্জের হিসাব
- করবর্ষ পরবর্তী সময়ে স্বপ্রণোদিতভাবে বিলম্ব রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে কর পরিগণনা
- অগ্রিম কর এবং উৎসে কর্তিত/সংগৃহীত করের ক্রেডিট
এই অংশটি মূলত রিটার্ন পূরণের সবচেয়ে জটিল ধাপ, অর্থাৎ প্রকৃত করদায় নির্ণয়ের সম্পূর্ণ পদ্ধতি ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দেয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
এটি মূলত স্বাভাবিক ব্যক্তি (Individual) করদাতাদের রিটার্ন পূরণ ও কর পরিপালনের জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি PDF আকারে ডাউনলোড করা যাবে।
www.etaxnbr.gov.bd প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ঘরে বসেই ই-রিটার্ন দাখিল করা যায়।
উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৬ ১ জুলাই, ২০২৬ থেকে কার্যকর করা হয়েছে, যা পূর্বের উৎসে কর বিধিমালা, ২০২৪ কে বাতিল করেছে।
উপসংহার
সব মিলিয়ে বলা যায়, আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ একজন সাধারণ করদাতার জন্য রিটার্ন পূরণের একটি হাতে-কলমে গাইড। রিটার্ন দাখিলের নিয়ম থেকে শুরু করে আয়ের খাতভিত্তিক হিসাব, কর রেয়াত এবং বাস্তব পেশাভিত্তিক উদাহরণ, সবকিছু এতে একসাথে পাওয়া যাবে। যারা প্রতিবার রিটার্ন পূরণ করতে গিয়ে হিসাব নিয়ে দ্বিধায় পড়েন, তাদের জন্য এই নির্দেশিকাটি একটি নির্ভরযোগ্য সহায়ক দলিল হতে পারে।
নিজের রিটার্ন সঠিকভাবে ও সময়মতো দাখিল করতে সম্পূর্ণ নির্দেশিকাটি একবার পড়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। নিচের লিংক থেকে আয়কর নির্দেশিকা ২০২৬-২০২৭ এর সম্পূর্ণ PDF ডাউনলোড করে নিন।

