আয়কর আইন ২০২৩ এর ধারা ৭৮ অনুযায়ী কোন নিবাসী স্বাভাবিক ব্যক্তি ও অনিবাসী স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা যদি ষষ্ঠ সিডিউল অংশ ৩ এ উল্লেখিত খাতে বিনিয়োগ করেন তাহলে তিনি মোট করদায় থেকে কর রেয়াত নিতে পারবেন। কোন কোন খাতে বিনিয়োগ করলে এই কর রেয়াত পাওয়া যায় তা অনেকেই না জানার কারণে আইনগতভাবেই আয়করের পরিমাণ কমানো সুবিধা নেওয়া থেকে বঞ্চিত হন।
তাই করদাতারা যদি অর্থবছরের শুরুতেই কর পরিকল্পনা করেন এবং সংশ্লিষ্ট খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন তাহলে তিনি এই কর রেয়াতে সুবিধাটা ভোগ করতে পারবেন। কোথায় কিভাবে বিনিয়োগ করলে কর রেয়াত পাওয়া যায় সেই বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করবো।
কর রেয়াত কি?
আয়কর রেয়াত পেতে কোথায় বিনিয়োগ করবেন?
আয়কর রেয়াত পেতে হলে কখন বিনিয়োগ করতে হবে?
সর্বোচ্চ কর রেয়াত পেতে কত টাকা বিনিয়োগ করবেন?
কর রেয়াত কি?
আয়কর রেয়াত (Tax Rebate) হলো আপনার প্রদেয় আয়করের উপর একটি ছাড় বা সুবিধা, যা সরকার নির্দিষ্ট কিছু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে করদাতাদের উৎসাহিত করার জন্য দিয়ে থাকে। এর ফলে আপনার মোট আয়কর থেকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কর বাদ দিয়ে প্রদেয় আয়কর নির্ণয় করা হয়।
সহজ কথায়, আপনি যদি সরকারের অনুমোদিত কিছু খাতে বিনিয়োগ করেন, তাহলে সরকার আপনাকে সেই বিনিয়োগের একটি অংশ আপনার আয়কর থেকে ছাড় দেয়।
আয়কর রেয়াত পেতে কোথায় বিনিয়োগ করবেন?
আয়কর আইন ২০২৩ এর ষষ্ঠ তফসিলের অংশ-৩ এ কররেয়াত যোগ্য বিনিয়োগ ও অনুদানের খাতের তালিকা দেওয়া হয়েছে। করদাতাকে কররেয়াতের সুবিধা নিতে হলে উক্ত খাতসমূহের ভিতর সুবিধামতো এক বা একাধিক খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। করযোগ্য বিনিয়োগ ও অনুদানে খাতগুলো সমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
- জীবন বীমা প্রিমিয়াম (বাৎসরিক মোট বীমাকৃত অংকের সর্বোচ্চ ১০%)
- সরকারী কর্মকর্তার প্রভিডেন্ট ফান্ডে চাঁদা
- Provident Fund Act, 1925 (Act No. 19 of 1925) এর বিধানবলি প্রযোজ্য এইরুপ যেকোন তহবিলে করদাতার চাঁদা
- স্বীকৃত ভবিষ্যত তহবিলে নিয়োগকর্তা ও কর্মকর্তার চাঁদা
- অনুমোদিত বার্ধক্য তহবিলে করদাতার বার্ষিক সাধারণ চাঁদা
- কল্যাণ তহবিল ও গোষ্ঠী বীমা তহবিলে চাঁদা
- অনধিক ৫ লক্ষ টাকার কোন সরকারী সিকিউরিটিজ যথা সরকার কর্তৃক ইস্যুকৃত ট্রেজারি বিল, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, ঋণপত্র, সুকুক বা শরীয়াহ ভিত্তিক ইস্যুকৃত সিকিউরিটি বা অনুরূপ দলিল ক্রয়
- কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ বা সম্পদ ব্যবস্থাপক বা ফান্ড ম্যানেজার কর্তৃক ইস্যুকৃত ইউনিট সার্টিফিকেট এবং মিউচুয়াল ফান্ড, ইটিএফ বা যৌথ বিনিমোগ স্কিম ইউনিট সার্টিফিকেট অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ
- যেকোন তফসিলি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডিপোজিট পেনশন স্কীমে বাৎসরিক সর্বোচ্চ ১,২০,০০০ টাকা বিনিয়োগ
- পুঁজি বাজারে নিবন্ধিত কোন শেয়ার, মিউচ্যুয়াল ফান্ড অথবা ডিবেঞ্চার এ বিনিয়োগ
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত কোন দাতব্য হাসপাতালে দান
- সমাজ কল্যাণ অধিদপ্তর এবং বোর্ড কর্তৃক অনুমোদিত প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে স্থাপিত প্রতিষ্ঠানে দান
- যাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩ দ্বারা বা ইহার অধীন প্রতিষ্ঠিত কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান
- সরকার কর্তৃক অনুমোদিত জনকল্যানমূলক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দান (এস. আর. ও. নং ১৫০-আইন/আয়কর-০৫/২০২৫ এ অনুমোদিত জনকল্যানমূলক বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তালিকা দেওয়া আছে)
- মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে নিয়োজিত জাতীয় পর্যায়ের কোন প্রতিষ্ঠানে অনুদান
আয়কর রেয়াত পেতে হলে কখন বিনিয়োগ করতে হবে?
কোন স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা উপরে উল্লেখিত খাতসমূহে বিনিয়োগ করে যদি আয়কর রেয়াত পেতে চান তাহলে তাকে অবশ্যই যে করবর্ষে এই সুবিধাটা নিবেন সেই করবর্ষের অর্থবৎসরে বিনিয়োগ করতে হবে। উদাহরণ দিয়ে যদি বলি, কোন স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা যদি করবর্ষ ২০২৫-২০২৬ এ আয়কর রিটার্নে কর রেয়াত নিতে চান, তাহলে তাকে অবশ্যই উক্ত কর বৎসরের অর্থবৎসর অর্থ্যাৎ ১লা জুলাই ২০২৪ থেকে ৩০শে জুন ২০২৫ এর ভিতর কর রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগ খাতে বিনিয়োগ করতে হবে। অর্থ্যাৎ, যে বৎসরে আপনি এই কর রেয়াতের সুবিধা নিতে চান তার আগের বৎসরের ১লা জুলাই থেকে উক্ত বৎসরের ৩০শে জুন পর্যন্ত সময়ের ভিতর এই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
সর্বোচ্চ কর রেয়াত পেতে কত টাকা বিনিয়োগ করবেন?
কর রেয়াতের জন্য বিনিয়োগের জন্য সর্বোত্তম পরিমাণ নির্ধারণ করতে, আয়কর আইন ২০২৩ এ নির্ধাধিত প্রদত্ত সীমা এবং নির্দেশিকাগুলি বুঝতে হবে। আপনি যদি জানেন কিভাবে কর রেয়াত নির্ণয় করা যায় তাহলে বুঝতে পারবেন আপনার আয়ের বিপরীতে কতটুকু বিনিয়োগ করলে সর্বোচ্চ কর রেয়াত বা কর ছাড় পেতে পারেন। তবে কর রেয়াত নির্ণয়ের নিয়মটি বেশ জটিল। কিভাবে বিনিয়োগজনিত কর রেয়াত নির্ণয় করতে হয় লেখাটি পড়ে আপনি সহজেই এই বিষয়ে ধারণা করতে পারবেন এবং সেই অনুযায়ী যথাসময়ে বিনিয়োগ করে কর রেয়াত নিতে পারবেন।
⭐️⭐️⭐️ আয়কর সম্পর্কিত সকল বিষয়ে জানতে এখানে ক্লিক করুন ⭐️⭐️⭐️
শেষকথা
কর রেয়াত বা কর ছাড়ের দাবি করতে হলে, আপনার বিনিয়োগের বিস্তারিত রেকর্ড (রিসিপ্ট, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, দলিল) যথাযথভাবে সংরক্ষণ করুন। কর ছাড়ের দাবি করতে আয়কর রিটার্ন সময়মতো জমা দেওয়া খুবই জরুরী, কারণ বিলম্বে জমা দেওয়া হলে জরিমানা হতে পারে এবং কর ছাড়ের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। প্রয়োজনে এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে একজন দক্ষ আয়কর আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করে নিতে পারেন।

