২০২৩ সালের নতুন আয়কর আইনে আয় পরিগণনাপত্র দাখিল এখন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বিশেষত কোম্পানি, নির্দিষ্ট টার্নওভারের ব্যবসায়ী এবং দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির আওতাভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এই নিয়ম এখন সরাসরি প্রযোজ্য। যদি আপনি একজন ব্যবসায়ী, করদাতা বা অ্যাকাউন্টিং পেশাজীবী হন, তাহলে এই পরিবর্তন আপনার জন্য জেনে রাখা দরকার।
আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৭৩-এর সংশোধনীতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কোন কোন করদাতাকে আয় পরিগণনাপত্র জমা দিতে হবে, কীভাবে দিতে হবে এবং কোথায় দিতে হবে। এই লেখাতে আমরা সেই বিষয়গুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করব যেন আপনি আইনের জটিলতা ছাড়াই পুরো বিষয়টি বুঝতে পারেন।
আয় পরিগণনাপত্র কী এবং কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ
আয় পরিগণনাপত্র বা Income Computation Sheet হলো একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাটে তৈরি করা নথি যেখানে করদাতার আয়, ব্যয়, মুনাফা এবং করযোগ্য আয়ের বিস্তারিত হিসাব থাকে। এটি শুধু একটি সাধারণ আয়কর রিটার্ন নয়। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী যা চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট বা আয়কর আইনজীবী দ্বারা প্রস্তুত ও প্রত্যয়িত হতে হয়।
নতুন আইনে আয় পরিগণনাপত্র দাখিল বাধ্যতামূলক করার উদ্দেশ্য হলো আয়কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং কর ফাঁকি রোধ করা।
আয় পরিগণনাপত্র দাখিল কাদের জন্য বাধ্যতামূলক
আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৭৩ অনুযায়ী, নিচের শ্রেণির করদাতাদের আয়কর রিটার্নের সাথে আয় পরিগণনাপত্র দাখিল করতে হবে:
- কোম্পানির আওতাভুক্ত সকল করদাতা
- দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি হইতে আয় রহিয়াছে এইরূপ যেকোনো ব্যক্তি
- সকল ফার্ম, ব্যক্তিসংঘ, হিন্দু অবিভক্ত পরিবার বা আইনবলে সৃষ্ট কৃত্রিম ব্যক্তির আওতাভুক্ত সকল করদাতা
- ধারা ১১৩-তে উল্লিখিত স্বর্ণ, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, রত্ন-হীরক বা প্লাটিনাম ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসায় নিয়োজিত যেকোনো ব্যক্তি
- ধারা ১৩০-তে উল্লিখিত সকল উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, সরবরাহকারী, পরিবেশক বা আড়তদার
এছাড়াও কোম্পানির আওতাভুক্ত সকল করদাতা এবং দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তি হইতে আয় রহিয়াছে এইরূপ যেকোনো ব্যক্তি অথবা ১০ কোটি টাকার অধিক টার্নওভার বা ৫ লক্ষ টাকার অধিক মূলধন রহিয়াছে, এইরুপ সকল ফার্ম, ব্যক্তিসংঘ, হিন্দু অবিভক্ত পরিবার বা আইনবলে সৃষ্ট কৃত্রিম ব্যক্তির আওতাভুক্ত সকল করদাতা ফার্ম, ব্যক্তিসংঘ, হিন্দু অবিভক্ত পরিবার বা আইনবলে সৃষ্ট কৃত্রিম ব্যক্তির আওতাভুক্ত সকল করদাতার আয়বর্ষের রিটার্নের সহিত দাখিলকৃত আয় বিবরণী ও আর্থিক বিবরণীসমূহ চার্টাড অ্যাকাউন্টেন্ট কর্তৃক নিরীক্ষিত ও প্রত্যয়িত হতে হবে।
কিভাবে আয় পরিগণনা করা হয়?
করদাতার আয় পরিগণনাপত্র প্রস্তুত করার সময় বিভিন্ন খাতের আয়গুলো যোগ করা হয়। এক্ষেত্রে আয়কর আইন ২০২৩ এর ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৮ ধারায় উল্লেখিত আয়গুলো বিবেচনা করা হবে। এরপর আয়কর আইন ২০২৩ এর ৪৯, ৫০, ৫১, ৫২, ৫৩ ও ৫৪ ধারায় উল্লেখিত ব্যবসা হতে বিয়োজনযোগ্য খরচ বা অনুমোদিত খরচগুলো বাদ দিয়ে এবং ধারা ৫৫ ও ৫৬ এ উল্লেখিত নির্দেশনা অনুযায়ী অননুমোদনযোগ্য খরচগুলো সমন্বয় করে চূড়ান্ত করযোগ্য আয় এবং পরিশোধযোগ্য কর পরিগণনা করা হয়।
আয় পরিগণনাপত্র দাখিলের সঠিক পদ্ধতি
আয় পরিগণনাপত্র দাখিল করতে হলে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে। সঠিক পদ্ধতিতে দাখিল না করলে রিটার্ন বাতিল বা জরিমানার মুখে পড়তে পারেন।
- যোগ্য পেশাজীবী নিয়োগ করুন: আয় পরিগণনাপত্র চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট অথবা আয়কর আইনজীবী দ্বারা প্রস্তুত ও প্রত্যয়িত হতে হবে।
- আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করুন: IAS, IFRS অনুসরণ করে হিসাব সংরক্ষণ করুন এবং ISA অনুসারে নিরীক্ষিত বিবরণী প্রস্তুত করুন।
- ব্যবসায়িক আয় চিহ্নিত করুন: ধারা ৪৫ অনুযায়ী সকল খাতের আয় চিহ্নিত করুন এবং অনুমোদনযোগ্য বিয়োজনসমূহ প্রয়োগ করুন।
- রিটার্নের সাথে একসাথে দাখিল করুন: আয় পরিগণনাপত্র এবং নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর প্রত্যয়িত কপি আয়কর রিটার্নের সাথে যুক্ত করে জমা দিন।
- নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাখিল করুন: নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সকল নথি জমা না দিলে জরিমানা আরোপিত হতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
আয় পরিগণনাপত্র দাখিল কি সবার জন্য বাধ্যতামূলক?
না, সবার জন্য নয়। আয়কর আইন ২০২৩-এর ধারা ৭৩ অনুযায়ী, মূলত কোম্পানি, ফার্ম বা ব্যক্তিসংঘ এবং দীর্ঘ মেয়াদি চুক্তির আওতাভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক।
আয় পরিগণনাপত্র দাখিলের জন্য কে নথি তৈরি করতে পারবেন?
আয় পরিগণনাপত্র দাখিলের জন্য নথিটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট অথবা আয়কর আইনজীবী দ্বারা প্রস্তুত ও প্রত্যয়িত হতে হবে।
উপসংহার
নতুন অর্থ আইন ২০২৬ এ আয়কর আইনে আয় পরিগণনাপত্র দাখিল বাধ্যতামূলক করা বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। এটি শুধু আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, এটি আপনার ব্যবসার আর্থিক স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাও বাড়ায়। যদি আপনি এই নিয়মের আওতায় পড়েন, তাহলে আজই একজন যোগ্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট বা আয়কর আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করুন এবং সঠিক সময়ে আয় পরিগণনাপত্র দাখিল নিশ্চিত করুন।

