বাংলাদেশে সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল নিবন্ধনের নিয়মে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) সম্প্রতি একটি স্পষ্টীকরণ জারি করে দানকর নিয়ম ২০২৬ সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করেছে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১২৫-এ নতুন একটি উপ-ধারা যুক্ত হওয়ায় এখন সম্পত্তি দান বা হেবার ক্ষেত্রে কর ব্যবস্থায় স্পষ্ট পার্থক্য টানা হয়েছে।
অনেকেই বিভ্রান্ত ছিলেন, জমি বা ফ্ল্যাট কাউকে দান করলে উৎসে কর দিতে হবে নাকি দানকর, আর কতটাই বা দিতে হবে। এই লেখায় সহজ ভাষায় বোঝানো হয়েছে, কোন ক্ষেত্রে দানকর প্রযোজ্য, কারা এই কর থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি পাবেন এবং করযোগ্য দানের ক্ষেত্রে কীভাবে সঠিক পরিমাণ হিসাব করতে হয়। জমি রেজিস্ট্রি করার আগে এই তথ্যগুলো জানা থাকলে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।
নতুন দানকর নিয়ম ২০২৬ আসলে কী বলছে
NBR-এর ৭ জুলাই ২০২৬ তারিখের স্পষ্টীকরণ অনুযায়ী, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১২৫-এ একটি নতুন উপ-ধারা (২ক) যুক্ত করা হয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিল যদি হেবা বা দানের মাধ্যমে নিবন্ধিত হয়, তাহলে নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা দানকর আইন, ১৯৯০ অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে দানকর সংগ্রহ করবেন। এই কর এ-চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হবে।
তবে এই নিয়ম শুধু দান বা হেবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর হলে দানকর প্রযোজ্য নয়, সেখানে আগের মতোই নির্ধারিত হারে উৎসে কর কাটা হবে। এই পার্থক্যটাই দানকর নিয়ম ২০২৬-এর কেন্দ্রীয় বিষয়।
কোন কোন দান সম্পূর্ণ কর মুক্ত
দানকর আইন, ১৯৯০-এর ধারা ৪ অনুযায়ী বেশ কিছু ক্ষেত্রে সম্পত্তি দানের ওপর কোনো দানকর ধার্যই হয় না। নিচে গুরুত্বপূর্ণ অব্যাহতির তালিকা দেওয়া হলো:
- দানকৃত সম্পত্তি বাংলাদেশের বাইরে অবস্থিত হলে
- সরকার বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে দান করা হলে
- স্বীকৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করলে, নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে
- ছেলে, মেয়ে, বাবা, মা, স্বামী বা স্ত্রী, আপন ভাই কিংবা আপন বোনকে দান করা হলে
- আর্থিক বছরে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত মূল্যের যেকোনো দান
- উইলমূলে বা মৃত্যুশয্যায় করা দান
লক্ষ করার বিষয়, নিকটাত্মীয়দের তালিকায় চাচাতো ভাই, মামাতো বোন বা অন্য দূর সম্পর্কের আত্মীয়রা পড়েন না। তাই এমন কাউকে সম্পত্তি দান করলে তা করযোগ্য দান হিসেবে গণ্য হবে।
দানকরের হার কীভাবে নির্ধারিত হয়
দানকর আইন, ১৯৯০-এর তফসিল অনুযায়ী কর নির্ধারণ হয় স্ল্যাব পদ্ধতিতে। প্রথমে সম্পত্তির মোট মূল্য থেকে ২০ হাজার টাকার মৌলিক অব্যাহতি বাদ দিতে হয়, এরপর বাকি অংশের ওপর ধাপে ধাপে কর বসে।
| করযোগ্য মূল্যের অংশ | কর হার |
|---|---|
| প্রথম ৫ লক্ষ টাকা | ৫% |
| পরবর্তী ১০ লক্ষ টাকা | ১০% |
| পরবর্তী ২০ লক্ষ টাকা | ১৫% |
| অবশিষ্ট অংশ | ২০% |
এই স্ল্যাব হার প্রতিটি করযোগ্য দানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সম্পত্তির মূল্য যত বেশি হবে, উচ্চ স্তরের হার ততই কার্যকর হতে থাকবে।
উদাহরণসহ দানকর হিসাব
ধরা যাক, কেউ তার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাইকে ৫০ লক্ষ টাকা মূল্যের একটি সম্পত্তি দান করলেন। যেহেতু চাচাতো ভাই অব্যাহতিপ্রাপ্ত আত্মীয়ের তালিকায় নেই, তাই পূর্ণ হিসাব করতে হবে।
- মোট মূল্য: ৫০,০০,০০০ টাকা
- মৌলিক অব্যাহতি বাদ: ২০,০০০ টাকা
- করযোগ্য মূল্য: ৪৯,৮০,০০০ টাকা
এরপর স্ল্যাব অনুযায়ী হিসাব করলে দাঁড়ায়:
- প্রথম ৫,০০,০০০ টাকায় ৫% = ২৫,০০০ টাকা
- পরবর্তী ১০,০০,০০০ টাকায় ১০% = ১,০০,০০০ টাকা
- পরবর্তী ২০,০০,০০০ টাকায় ১৫% = ৩,০০,০০০ টাকা
- অবশিষ্ট ১৪,৮০,০০০ টাকায় ২০% = ২,৯৬,০০০ টাকা
সব মিলিয়ে মোট দানকর দাঁড়ায় ৭,২১,০০০ টাকা। এই পরিমাণ নিবন্ধনের সময় এ-চালানের মাধ্যমে জমা দিতে হবে।
সম্পত্তির মূল্য কীভাবে নির্ধারণ হয়
দানকর আইন, ১৯৯০-এর ধারা ৫ অনুযায়ী, দানের তারিখে সম্পত্তি খোলা বাজারে যে মূল্যে বিক্রি হতে পারত, সেটাই তার মূল্য হিসেবে ধরা হয়। যদি সম্পত্তি খোলা বাজারে বিক্রয়যোগ্য না হয়, তাহলে বিধি অনুযায়ী নির্ধারিত পদ্ধতিতে মূল্য নিরূপণ করা হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মৌজা মূল্য বা বাজারমূল্য যাচাই করে নেওয়া উচিত।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
না, ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরে দানকর প্রযোজ্য নয়, সেখানে শুধু উৎসে কর কাটা হয়।
না, ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী ও আপন ভাই-বোনকে করা দান দানকর আইনের অধীনে সম্পূর্ণ অব্যাহতিপ্রাপ্ত।
দলিল নিবন্ধনের সময় নিবন্ধনকারী কর্মকর্তা প্রযোজ্য দানকর এ-চালানের মাধ্যমে সংগ্রহ করেন।
তফসিল অনুযায়ী করযোগ্য মূল্যের অবশিষ্ট অংশের ওপর সর্বোচ্চ হার ২০ শতাংশ।
না, তারা অব্যাহতিপ্রাপ্ত নিকটাত্মীয়ের তালিকায় নেই, তাই তাদের করা দান তফসিলের হার অনুযায়ী করযোগ্য হবে।
শেষকথা
সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দানকর নিয়ম ২০২৬ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা এখন প্রতিটি জমি বা ফ্ল্যাট মালিকের জন্য জরুরি। দান বা হেবার মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর করার আগে গ্রহীতা নিকটাত্মীয়ের তালিকায় পড়েন কিনা, আর সম্পত্তির মূল্য অব্যাহতি সীমা ছাড়িয়ে যায় কিনা, এই দুটো বিষয় যাচাই করে নেওয়া উচিত। এতে নিবন্ধনের সময় হঠাৎ বড় অঙ্কের কর দিতে হওয়ার ঝুঁকি এড়ানো যাবে। দলিল নিবন্ধনের আগে স্থানীয় সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বা একজন কর পরামর্শকের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।

