Site icon Chartered Journal

দোকান ভাড়া চুক্তিপত্র করার সঠিক নিয়ম

Dokan Vara Deed

আপনি কি ব্যবসা শুরু করার জন্য একটি দোকান ভাড়া নিতে চাইছেন? দোকান বা শোরুম ভাড়া নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কেবল চাবি হস্তান্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপ, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক জটিলতা এড়াতে সাহায্য করে। একটি সুস্পষ্ট এবং আইনসম্মত দোকান ভাড়া চুক্তিপত্র (Dokan Vara Deed) তৈরি করা এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কিন্তু এই চুক্তিপত্র কিভাবে তৈরি করবেন? কত টাকার স্ট্যাম্প ব্যবহার করতে হবে? এবং চুক্তিতে কোন কোন শর্তগুলো অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার? আজকের লেখায় আমরা এই সকল প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেব। চলুন, আপনার দোকান ভাড়ার চুক্তিকে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত করার পদ্ধতি ধাপে ধাপে জেনে নেওয়া যাক।

দোকান ভাড়া চুক্তিপত্র কাঠামো

একটি দোকান ভাড়া চুক্তিপত্র শুরু হয় মালিক (প্রথম পক্ষ) এবং ভাড়াটিয়া (দ্বিতীয় পক্ষ)-এর পরিচয় দিয়ে। নির্ভুল চুক্তি তৈরির জন্য এই অংশটি অত্যন্ত জরুরি।

১. পক্ষগণের পরিচয় (Parties’ Information)

চুক্তিপত্রের একদম শুরুতে পক্ষগণের বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করতে হবে:

২. চুক্তির উদ্দেশ্য বর্ণনা

এরপর সংক্ষেপে উল্লেখ করতে হবে যে, প্রথম পক্ষ তফসিল বর্ণিত দোকান ঘরের মালিক এবং দ্বিতীয় পক্ষ সেই দোকানটি নির্দিষ্ট শর্তাবলী মেনে ভাড়া নিতে আগ্রহী।

দোকান ভাড়া চুক্তির প্রধান শর্তাবলী (Terms and Conditions)

চুক্তিপত্রের মূল অংশে নিম্নলিখিত শর্তগুলি সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করা অপরিহার্য:

১. ভাড়ার মেয়াদ (Duration)

চুক্তির মেয়াদ কত বছরের জন্য হবে (যেমন: দুই বছর, পাঁচ বছর বা দশ বছর) তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। চুক্তির শুরুর তারিখ এবং শেষের তারিখ অবশ্যই উল্লেখ থাকতে হবে।

২. অগ্রিম ও জামানত (Advance Payment/Security Deposit)

দোকান ভাড়া নেওয়ার সময় জামানত বাবদ কত টাকা অগ্রিম দেওয়া হলো, তা সংখ্যায় ও কথায় উল্লেখ করতে হবে। চুক্তির মেয়াদ শেষে দোকান মালিকের বরাবরে বুঝিয়ে দেওয়ার পর মালিক সেই অগ্রিমের টাকা দ্বিতীয় পক্ষকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন। উল্লেখ্য, এই অগ্রিমের টাকা থেকে কোনো টাকা কর্তন করা হবে না।

৩. মাসিক ভাড়া ও পরিশোধের সময়

দোকানের মাসিক ভাড়ার পরিমাণ (যেমন: ৭,০০০ টাকা) স্পষ্টভাবে ধার্য ও স্থির করতে হবে। সেই সাথে, প্রতি মাসের ভাড়া পরবর্তী মাসের কত তারিখের মধ্যে (যেমন: ১ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে) মালিককে প্রদান করতে হবে, তার সময়সীমা উল্লেখ করতে হবে।

৪. খরচাদি ও বিল বহন

নিম্নলিখিত খরচগুলি কোন পক্ষ বহন করবে, তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে:

৫. চুক্তি বাতিলের নোটিশ (Termination Notice)

যদি মেয়াদের মধ্যে মালিকের বা ভাড়াটিয়ার দোকানটি প্রয়োজন হয়, তবে তিনি কত মাস পূর্বে অপর পক্ষকে জানাতে বাধ্য থাকবেন—তা উল্লেখ করতে হবে। সাধারণত এই সময়সীমা ৩ (তিন) মাস হয়ে থাকে।

৬. উপভাড়া ও ব্যবসার ধরন

৭. দুর্ঘটনা ও ক্ষতিপূরণ

চুক্তিতে স্পষ্ট করে দিতে হবে যে, দোকান ঘরে কোনো প্রকার দুর্ঘটনা ঘটলে (যেমন: আগুন লাগা বা অন্য কোনো ক্ষতি) তার সব প্রকার ক্ষতি ভাড়াটিয়া নিজে বহন করবেন এবং এর জন্য মালিক পক্ষ কোনো প্রকার দায়-দায়িত্ব বহন করিবে না।

আইনি বাধ্যবাধকতা ও চুক্তি সম্পন্নকরণ

একটি দোকান ভাড়া চুক্তিপত্রকে আইনগত বৈধতা দেওয়ার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলি অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে:

১. স্ট্যাম্প পেপারের মূল্য

একটি দোকান ভাড়া চুক্তিপত্র অবশ্যই সরকার নির্ধারিত মূল্যের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করতে হবে।

বর্তমানে একটি দোকান ভাড়া চুক্তিপত্র আপনাকে ৩০০ (তিনশত) টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সম্পন্ন করতে হবে। (পূর্বে এটি ২০০ টাকার স্ট্যাম্পে করা হতো)।

২. নোটারি ও আইনগত বৈধতা

চুক্তিপত্রটি স্বাক্ষর করার পর, আপনাদেরকে অবশ্যই নোটারি পাবলিকের কাছে গিয়ে দলিলটি নোটারি করাতে হবে। নোটারি করানোর পরই আপনার দোকান ভাড়া চুক্তিপত্রটি আইনগত বৈধতা লাভ করবে।

৩. তফসিল ও সাক্ষীর স্বাক্ষর

দোকান ভাড়া চুক্তিপত্র নমুনা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

“দোকান ঘর ভাড়ার চুক্তিপত্র”

মোঃ আতিকুর রহমান, পিতা- হাজী মোঃ বজলুর রহমান, (ঠিকানা: রোড নং, উপজেলা, জেলা), জাতীয়তা-বাংলাদেশী, ধর্ম-ইসলাম, পেশা-ব্যবসা। —————————প্রথম পক্ষ (মালিক)।

মুহিবুল ইসলাম, পিতা-নুরুল ইসলাম, (ঠিকানা: রোড নং, উপজেলা, জেলা), জাতীয়তা-বাংলাদেশী, ধর্ম-ইসলাম, পেশা-ব্যবসা। —————————দ্বিতীয় পক্ষ (ভাড়াটিয়া)।

পরম করুনাময় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নাম স্মরণ করিয়া দোকান ঘর ভাড়ার চুক্তিপত্র দলিলের বর্ণনা আরম্ভ করিলাম। যেহেতু আমি প্রথম পক্ষ তফসিল বর্ণিত দোকান ঘরের মালিক বটে। বর্তমানে আমার তফসিল বর্ণিত দোকান ঘর খানা মাসিক ভাড়া দিবার ইচ্ছা ঘোষণা করিলে পর আপনি দ্বিতীয় পক্ষ উহা ভাড়ায় নিতে আগ্রহ প্রকাশ করিলে আমরা উভয় পক্ষ বর্ণিত শর্তাবলী মানিয়া নিয়া অত্র চুক্তিপত্রে আবদ্ধ হইলাম।

শর্তাবলী

১। অত্র দোকান ঘরের মেয়াদ ০৫ (পাঁচ) বছর মেয়াদের জন্য ভাড়া দেওয়া হইল। দোকানের মেয়াদ ০১/০১/২০২২ ইং হইতে আরম্ভ হইয়া আগামী ৩১/১২/২০২৬ ইং তারিখে শেষ হইবে।

২। দোকানের অগ্রিম বাবদ মং-১০,০০,০০০/-(দশ লক্ষ) টাকা প্রথম পক্ষ/মালিক, দ্বিতীয় পক্ষ/ভাড়াটিয়ার নিকট হইতে নগদে এককালীন গ্রহণ করিলেন। যাহা মেয়াদ শেষে দোকান ঘর খানা মালিকের বরাবরে দিবার পর মালিক উক্ত অগ্রিম ১০,০০,০০০/-(দশ লক্ষ) টাকা দ্বিতীয় পক্ষের বরাবরে ফেরত দিতে বাধ্য থাকিবেন।

৩। দোকানের মাসিক ভাড়া মং-৭,০০০/-(সাত হাজার) টাকা ধার্য্য ও স্থির করা হইল। প্রতি মাসের মাসিক ভাড়া পরবর্তী মাসের ১-১০ তারিখের মধ্যে মালিকের বরাবরে দ্বিতীয় পক্ষ প্রদান করিতে বাধ্য রহিলেন।

৪। উক্ত অগ্রিমের টাকা হইতে কোন টাকা কর্তন করা হইবে না।

৫। দোকানের বিদ্যুৎ বিল ও মার্কেটের দারোয়ানের বেতন ইত্যাদি দ্বিতীয় পক্ষ বহন করিবেন।

৬। দোকান মেরামতের যাবতীয় খরচাদি দ্বিতীয় পক্ষ/ভাড়াটিয়া বহন করিবেন।

৭। মেয়াদ মধ্যে দোকান ঘর মালিকের প্রয়োজন হইলে ৩ (তিন) মাস পূর্বে ভাড়াটিয়াকে জানাইতে হইবে এবং ভাড়াটিয়াও যদি মেয়াদ মধ্যে দোকান ঘর ছাড়িয়া দিতে চায় তাহা ৩ (তিন) মাস পূর্বে মালিককে জানাইতে হইবে।

৮। দোকান ঘর করার সময় যে কোন প্রকারের দুর্ঘটনা হলে সব প্রকার ক্ষতি ভাড়াটিয়া নিজে বহন করিবেন। এর জন্য মালিক পক্ষ কোন প্রকার দায়-দায়িত্ব বহন করিবে না।

৯। দ্বিতীয় পক্ষ দোকান ঘরে কোন প্রকার অবৈধ ব্যবসা করিতে পারিবে না, আর করিলে তাহার জন্য দ্বিতীয় পক্ষই দায়ী থাকিবেন।

১০। ভাড়া কৃত দোকান ঘর খানা দ্বিতীয় পক্ষ অন্য কাহারো নিকট উপভাড়া বা হস্তান্তর করিতে পারিবে না, মেয়াদ শেষে মালিকের বরাবরে বুঝাইয়া দিতে বাধ্য থাকিবেন।

এতদার্থে স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে সুস্থ্য শরীরে অন্যের বিনা প্ররোচনায় অত্র দলিলের মর্ম অবগত হইয়া সাক্ষীগণের মোকাবেলায় নিজ নিজ নাম সহি করিলাম। ইতি, তাং-

তফসিল

জেলা- , থানা- , এ অবস্থিত একটি দোকান ঘর অত্র দলিলে ভাড়া কৃত বটে।

সাক্ষীগণের স্বাক্ষর ও ঠিকানাঃ

১। ________________________________

২। ________________________________

৩। ________________________________

____________________________________

প্রথম পক্ষ/মালিকের স্বাক্ষর

____________________________________

দ্বিতীয় পক্ষ/ভাড়াটিয়ার স্বাক্ষর

দোকান ভাড়া চুক্তিপত্র নমুনা ডাউনলোড

উপরে উল্লেখিত দোকান ভাড়া চুক্তিপত্র নমুনা কপি এর ডকুমেন্ট ফাইল ডাউনলোড করতে নিচের ডাউনলোড লিংকটি ক্লিক করুন। নমুনা কপিটি ডাউনলোড করে প্রয়োজনীয় সংযোজন ও বিয়োজন করে আপনি আপনার দোকান ভাড়া চুক্তিপত্রটি তৈরি করতে পারবেন। প্রয়োজনে এই বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন আইনজীবীর পরামর্শ গ্রহণ করুন।

শেষকথা

একটি সুস্পষ্ট ও আইনসম্মত দোকান ভাড়া চুক্তিপত্র আপনার এবং আপনার ব্যবসার জন্য ঢাল স্বরূপ। এটি কেবল মালিক-ভাড়াটিয়ার সম্পর্ককে সংজ্ঞায়িত করে না, বরং ভবিষ্যতে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিবাদ বা আইনি ঝামেলা থেকে উভয় পক্ষকে রক্ষা করে।

সুতরাং, শুধু মৌখিক কথার উপর নির্ভর না করে, আজই উপরোক্ত শর্তগুলো মেনে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে আপনার দোকান ভাড়ার চুক্তিপত্রটি নোটারি করিয়ে নিন। এমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিপত্র তৈরিতে অভিজ্ঞ আইনজীবীর সহায়তা নিতে পারেন। আপনার কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্ট করুন!

Exit mobile version